খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গুরুতর স্বার্থসংঘাতের অভিযোগ তুলেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এই নিয়োগে শক্তিশালী স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং এমন পরিস্থিতিতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব ওই ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি সরকারের কাছে নিয়োগটি পুনর্বিবেচনা করে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন। নতুন সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁর বিরুদ্ধে যদি শক্তিশালী স্বার্থসংঘাতের অভিযোগ থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “যদি এমন কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার সঙ্গে অতীতে বিতর্কিত আর্থিক কর্মকাণ্ড বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং তা রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং নতুন গভর্নর নিয়োগের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন তোলেন। জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি এর পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ষড়যন্ত্র থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আর্থিক খাতে অতীতে যে ধরনের লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যদি আবার ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক হবে না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের বিভিন্ন পদে জোরপূর্বক বদলি বা রদবদল প্রসঙ্গে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি “এবার আমাদের পালা” সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এই প্রবণতা যদি নতুন সরকার প্রতিহত করতে না পারে, তাহলে সেটি সরকারের জন্যই আত্মঘাতী হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তবে একই সঙ্গে কিছু ঘটনা উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—একজন মন্ত্রীর চাঁদাবাজি সম্পর্কিত বিতর্কিত মন্তব্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে গভর্নর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া, এবং দুর্নীতি দমন কমিশন–এর চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ ঘিরে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা।
নিম্নে টিআইবির প্রধান উদ্বেগগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | টিআইবির উদ্বেগ | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ | স্বার্থসংঘাতের অভিযোগ | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে |
| আর্থিক খাতে বিতর্কিত গোষ্ঠীর প্রভাব | লুটপাটে অভিযুক্তদের পুনরায় প্রভাব বিস্তার | আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা |
| প্রশাসনে জোরপূর্বক বদলি | “এবার আমাদের পালা” সংস্কৃতি | প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে |
| দুদকের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা | পদত্যাগ ও বিতর্ক | দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে দুর্বলতা |
সব মিলিয়ে টিআইবি মনে করছে, নতুন সরকারের সামনে একদিকে যেমন সংস্কারের সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকিও। তাই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগসহ নীতিগত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।