খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলনে বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিভিন্ন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ‘পুনর্গঠন’ বা নতুনভাবে গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। গত শুক্রবার শুরু হওয়া এই সম্মেলনে ৬০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস একটি ‘নতুন ট্রান্সআটলান্টিক অংশীদারত্ব’-এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ন্যাটো কেবল ইউরোপের নিরাপত্তার কবচ নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। মের্ৎস দুই পক্ষের মধ্যে পুনরায় আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বরাবরের মতোই একটি ‘শক্তিশালী ইউরোপ’ বা ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
নিচে সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ও নেতাদের অবস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| নেতার নাম ও পদবি | মূল বার্তা/অবস্থান | গুরুত্বের ক্ষেত্র |
| ফ্রিডরিখ মের্ৎস (চ্যান্সেলর, জার্মানি) | ট্রান্সআটলান্টিক আস্থা পুনরুদ্ধার | ন্যাটোর সম্মিলিত শক্তি ও সুবিধা |
| এমানুয়েল মাখোঁ (প্রেসিডেন্ট, ফ্রান্স) | শক্তিশালী ও সার্বভৌম ইউরোপ গঠন | প্রতিরক্ষা খাতে স্বনির্ভরতা |
| কিয়ার স্টারমার (প্রধানমন্ত্রী, যুক্তরাজ্য) | ইউরোপকে ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ হিসেবে উল্লেখ | যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা হ্রাস |
| মার্ক রুতে (মহাসচিব, ন্যাটো) | শক্তিশালী ন্যাটোর ভেতরে শক্তিশালী ইউরোপ | ইউরোপীয় দেশগুলোর বাজেট বৃদ্ধি |
| ওয়াং ই (পররাষ্ট্রমন্ত্রী, চীন) | সংলাপ সংঘাতের চেয়ে উত্তম | বৈশ্বিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা |
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ভাষণ ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ হিসেবে অভিহিত করে নিজের দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন। মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য একক সিদ্ধান্ত বা ন্যাটোর প্রতি অনীহার আশঙ্কায় ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিতে শুরু করেছে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে জানিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন আগের তুলনায় ন্যাটোর ভেতরে অনেক বেশি সক্রিয় নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা এবং সামরিক সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। এছাড়া মার্কো রুবিও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। চীনা বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াং ই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে দ্বন্দ্বের বদলে সহযোগিতা এবং সংঘাতের বদলে সংলাপকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের এই আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইউরোপ এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে থাকতে চায় না। তারা একদিকে যেমন ন্যাটোর বন্ধন দৃঢ় করতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে মরিয়া। আগামী কয়েক দিনে এই সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো বিশ্ব রাজনীতির মোড় পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।