খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভোরের আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের প্রাঙ্গণটি ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ফজরের নামাজ শেষে শুরু হয় রমজান মাসজুড়ে চলা দৈনিক ইফতার প্রস্তুতি, যেখানে লক্ষ্য প্রতিদিন ছয় হাজার মানুষের জন্য খাবার তৈরি করা।
ঐতিহ্যবাহী এই মিশনে বড় বড় কড়াইতে ছোলা রান্না, ডেকে ডেকে ফিরনি তৈরি এবং সারি সারি সিঙ্গারা ভাজার দৃশ্য ভোর থেকেই রমজানের রং ছড়িয়ে দেয়। রান্নার এই মহাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেন প্রায় পঞ্চাশজন বাবুর্চি এবং দুইশতপঞ্চাশ স্বেচ্ছাসেবক।
বাবুর্চি আমানত আলী, যিনি ২৫ বছর ধরে ইফতার প্রস্তুতির দায়িত্বে আছেন, জানান, প্রতিদিন ১৯০ কেজি ছোলা, ১৪৪ কেজি সুজি, ১৫০ কেজি চিনি এবং ৬০০ কেজি দুধ দিয়ে সাত ডেকের ফিরনি তৈরি হয়। তিনি বলেন, “ভোর থেকে কাজ শুরু করি, দুপুর তিনটার মধ্যে সব কাজ শেষ করতে হয়। এই পারিশ্রমিকেই আল্লাহর রহমতে চলে। পীর সাহেবের দোয়া আমাদের সঙ্গে রয়েছে।”
সিঙ্গারা তৈরির কাজে নিয়োজিত মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি সহ পাঁচ-ছয় জন ভোর ছয়টা থেকে কাজ শুরু করি। প্রতিদিন ১৮০ কেজি আলু কাটা হয় এবং ১৫৪ কেজি ময়দার খামির তৈরি করা হয়। সীমিত পারিশ্রমিক হলেও এখানে কাজ করলে শান্তি পাওয়া যায়।”
প্রতিদিন ইফতার প্লেট সাজানো এবং বিতরণে কাজ করেন ২৫০ থেকে ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক। প্রতিটি প্লেটে খেজুর, কলা, চিড়া, ছোলা এবং ফিরনি রাখা হয়।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, “নলতা শরীফে পহেলা রমজান থেকে ৩০ রমজান পর্যন্ত প্রতিবছর এ আয়োজন চলে। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে এই সেবায় যুক্ত আছি।” স্থানীয় ভক্ত আনসার আলী বলেন, “এখানে এসে নামাজ ও ইফতার মিলিয়ে সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করি। ৬-৭ রকম ইফতারি পরিবেশিত হয় এবং সবাই মিলেমিশে ইফতার করি।”
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, “প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার ব্যয় হয়। এই অর্থ আসে দেশ-বিদেশের ভক্ত ও দাতাদের অনুদানে। আমরা শুধু ব্যবস্থাপনা করি। প্রায় ৫০ জন বাবুর্চি এবং ২৫০ স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করেন।”
১৯৩৫ সালে সাধক খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ (র.) মিশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে স্থানীয়রা বাড়ি থেকে রান্না নিয়ে একত্রিত হতেন, যা আজ ছয় হাজার মানুষের ইফতারের মহাসমাবেশে রূপ নিয়েছে।
| প্রস্তুতির ধাপ | পরিমাণ/সংখ্যা | দায়িত্বপ্রাপ্তরা |
|---|---|---|
| ছোলা রান্না | ১৯০ কেজি | বাবুর্চি আমানত আলী সহ ৫০ জন |
| ফিরনি তৈরি | ৭ ডেক (সুজি ১৪৪ কেজি, চিনি ১৫০ কেজি, দুধ ৬০০ কেজি) | বাবুর্চি দল |
| সিঙ্গারা প্রস্তুতি | আলু ১৮০ কেজি, ময়দা ১৫৪ কেজি | মো. আসাদুজ্জামান সহ ৫-৬ জন |
| ইফতার প্লেট সাজানো | ৬ হাজার প্লেট | ২৫০-৩০০ স্বেচ্ছাসেবক |
| দৈনিক ব্যয় | ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা | দাতাদের অনুদান |
নলতার এই দৈনিক ইফতার আয়োজন শুধু খাদ্য বিতরণ নয়, বরং সামাজিক একতা ও মানবসেবার একটি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রমজান মাসজুড়ে এই মহাসমাবেশ মানুষের মনে নলতা শরীফের বিশেষ স্থানের গুরুত্ব আরও উজ্জ্বল করে।