খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্ব কিংবা সামাজিক চাপের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য দক্ষ ও শিক্ষিত নারী তাঁদের উজ্জ্বল পেশাজীবনের ইতি টানতে বাধ্য হন। দীর্ঘ বিরতির পর এই নারীরা যখন পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরতে চান, তখন তাঁদের নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এই ‘ক্যারিয়ার ড্রপআউট’ রোধে এবং অভিজ্ঞ নারীদের পেশাগত মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক চালু করেছে অনন্য এক কর্মসূচি—‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সভায় জানানো হয়, কর্মবিরতিতে থাকা নারীদের ৯৮.৫ শতাংশই পুনরায় কাজে ফিরতে আগ্রহী হলেও উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতার অভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন।
ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক ও মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব পালনই নারীদের কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ার প্রধান কারণ। প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী এই দুটি কারণেই কাজ ছাড়তে বাধ্য হন। এছাড়া বিরূপ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক চাপও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
নারীদের চাকরি ছাড়ার ও পুনরায় ফেরার কারণসমূহ:
| বিষয় | কারণের ধরন | হার (%) |
| চাকরি ছাড়ার কারণ | পারিবারিক দায়িত্ব | ৩৮.৮% |
| মাতৃত্বকালীন সময় | ৩৬.০% | |
| বিরূপ কর্মপরিবেশ | ৮.৫% | |
| সামাজিক চাপ | ৪.৭% | |
| কাজে ফেরার অনুপ্রেরণা | পেশাগত উন্নতি | ৭৬.৫% |
| অর্থনৈতিক স্বাধীনতা | ৫৬.৫% | |
| পরিবারে অবদান রাখা | ৪২.৭% |
ব্র্যাকের এই উদ্যোগটি মূলত একটি ছয় মাস মেয়াদী ইন্টার্নশিপ বা কর্মসংস্থান কর্মসূচি। গত বছর ১৫ জন নারীকে নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে এবছর ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে ২৪ জনকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়েছে। এই ছয় মাস তাঁরা ব্র্যাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি তাঁদের নেতৃত্ব উন্নয়ন, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে আধুনিক কর্মপরিবেশের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর সভায় বলেন, “নারীরা যখন দীর্ঘ বিরতির পর চাকরির আবেদন করেন, তখন তাঁদের প্রতি অনেক সময় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতাকে খাটো করে দেখা হয়। ব্রিজ রিটার্নশিপ মূলত এই নারীদের জন্য একটি ‘প্র্যাকটিক্যাল সলিউশন’ বা বাস্তব সমাধান হিসেবে কাজ করছে।”
দীর্ঘ বিরতির পর কাজে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিয়োগকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এবছর নির্বাচিত ২৪ জনের একজন জাহরুন জান্নাত তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “বাচ্চার বয়স এক বছর হওয়ার পর যখনই চাকরির আবেদন করতাম, আমাকে প্রশ্ন করা হতো আমি সন্তান সামলে কাজ করতে পারব কি না। অথচ আমার আগের চার বছরের অভিজ্ঞতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চাচ্ছিল না।”
ব্র্যাক শুধু এই ২৪ জনকেই সুযোগ দিচ্ছে না, বরং আবেদনকারীদের মধ্যে অত্যন্ত দক্ষ আরও ১২০ জন নারীর জীবনবৃত্তান্ত ও তথ্য বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া যারা চাকরিতে ফিরতে পারবেন না, তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
পেশাজীবী নারীদের এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। যখন একজন অভিজ্ঞ নারী পুনরায় কাজে ফেরেন, তখন প্রতিষ্ঠান যেমন তৈরি মেধা পায়, তেমনি সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়। ব্র্যাকের এই ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ মডেলটি যদি সরকারি ও বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।