খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 29শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১৩ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। তাঁদের সামনে তখন ছিল একটি বড় সিদ্ধান্ত—গাজা উপত্যকা পুরোপুরি পুনর্দখল করা হবে, নাকি বর্তমান কৌশলেই অভিযান চলবে।
বর্তমান ও সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং সরকারি উপদেষ্টারা নিশ্চিত করেছেন, গত শুক্রবার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজা সিটিতে প্রবেশ করবে। গাজার শেষ প্রধান শহর হিসেবে এটি এখনো ইসরায়েলের দখলে যায়নি। গাজা সিটি নিয়ন্ত্রণে নিলে ইসরায়েল উপত্যকার আরও ১০ শতাংশ এলাকা দখল করবে এবং পুরো জনসংখ্যাকে অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ জমিতে ঠেলে দেবে। বর্তমানে আইডিএফ গাজার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পরিকল্পনার সংবেদনশীলতার কারণে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন।
গাজা সিটিতে প্রবেশের পরিকল্পনাটি ছিল সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রস্তাবের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী। কর্মকর্তারা শহরটি ঘিরে বাইরে থেকে হামলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা ছিল নেতানিয়াহু ও তাঁর রাজনৈতিক মিত্রদের পুরো গাজা দখলের ইচ্ছার তুলনায় সীমিত। পুরো গাজা দখলে পাঁচটি সেনা ডিভিশন লাগলেও পর্যায়ক্রমিক অভিযানে এর অর্ধেকেরও কম ব্যবহার হবে। সেনারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হবেন এবং তা শুরু হবে কেবল তখনই, যখন আগামী মাসে গাজা সিটির প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দাকে—যাঁদের অনেকে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন—সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, যদিও তাঁদের যাওয়ার মতো জায়গা থাকবে না।
এই সিদ্ধান্ত আসে বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহুর ফক্স নিউজ সাক্ষাৎকারে গাজা পুরোপুরি দখলের ইঙ্গিত দেওয়ার ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে। এতে তাঁর অতিদক্ষিণপন্থী মিত্ররা বিরক্ত হলেও ঘটনাটি প্রমাণ করেছে, শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা এখনো নেতানিয়াহু ও বেসামরিক নেতৃত্বের বিরোধিতা করতে সক্ষম। দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের ইতিহাসে সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে সবচেয়ে তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। ১৯৬৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাজা দখলে রেখেছিল ইসরায়েল।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজের উপদেষ্টা ও বর্তমানে নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের জ্যেষ্ঠ ফেলো নিমরোদ নভিক বলেন, ‘যদি মন্ত্রিসভা জামিরের ওপর পুরো গাজা দখলের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিত, সেটি হতো নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বসম্মত মত উপেক্ষা করার নজিরবিহীন ঘটনা। নিরাপত্তা মহল প্রধানমন্ত্রীকে পরিকল্পনার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে বাধ্য করেছে।’
ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, সামরিকভাবে আর বড় কোনো সাফল্য সম্ভব নয়। ২২ মাস পরও গাজায় অন্তত ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি জিম্মি রয়েছেন। অপরদিকে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত মার্চ থেকে ত্রাণ অবরোধে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং খাদ্যাভাব তীব্র হয়েছে।
প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে খবর ফাঁস হচ্ছিল—নেতানিয়াহু ও মন্ত্রীরা জামিরকে পুরো গাজা দখলে চাপ দিচ্ছেন, আর জামির সতর্ক করছেন—এটি ইসরায়েলি সেনাদের বড় ঝুঁকি তৈরি করবে এবং গাজার শাসন সেনাবাহিনীর জন্য বিপজ্জনক হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির জামিরকে সরকারের আদেশ মানার শপথ নিতে বলেন। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ায়ির নেতানিয়াহু সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেন যে তিনি ‘সত্তরের দশকের মধ্য আমেরিকার মতো কোনো অস্থিতিশীল প্রজাতন্ত্রে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে চাইছেন।’ অন্যদিকে বৈঠকের কয়েক দিন আগে আইডিএফ, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের এক ডজনের বেশি সাবেক প্রধান এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানান। বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে সেনাপ্রধান জামিরের এক বক্তব্য প্রকাশ করে সেনাবাহিনী। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিতর্কের সংস্কৃতি ইহুদি জনগণের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আইডিএফ নির্ভয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে থাকবে।’
রবিবার নেতানিয়াহু গাজা সিটিতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দেন। তিনি বলেন, ‘আমি আইডিএফ, এর কমান্ডার ও সৈনিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখি। কিন্তু আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আইডিএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতের বিপরীতে গিয়ে। আমরা একটি দেশ, যার একটি সেনাবাহিনী আছে; সেনাবাহিনীর একটি দেশ নই।’ বিদেশি সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে শুধু ক্লান্তিকর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সফল হয়নি। এতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে, কিন্তু শেষ হবে না।’
শুক্রবার স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বে কারনি সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে ডজনখানেক আইডিএফের যানবাহন জড়ো রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে জানা গেছে, জুলাইয়ের শুরু থেকেই সেখানে সেনা চলাচল বাড়ছে। রবিবার গভীর রাতে ইসরায়েল গাজা সিটিতে ‘ফায়ার বেল্ট’ বোমাবর্ষণ শুরু করে। সাংবাদিক আনাস আল-শরিফের পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত হয়। এর কম সময়ের মধ্যেই শরিফকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হত্যা করে আইডিএফ। ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ জানিয়েছে, তিনি গাজায় নিহত অন্তত ১৭৮ জন সাংবাদিকের একজন।
নেতানিয়াহুর এক উপদেষ্টা বলেন, গাজা সিটিতে হামলা জরুরি, কারণ এতে হামাসের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে। এভাবে হামাসের সর্বশেষ জীবিত শীর্ষ কমান্ডার ইজ্জ আদ-দীন আল-হাদ্দাদকে নিশানা করা যাবে এবং ইসরায়েল এমন কিছু স্থানীয় উপজাতি নেতাকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে, যাঁদের ধাঁচ হবে ইয়াসের আবু শাবাবের মতো। এ ব্যক্তিকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার পাশাপাশি গাজায় ত্রাণ লুটের অভিযোগ রয়েছে।
ছয় মাস আগে নেতানিয়াহু জামিরকে সেনাপ্রধান করেন ভেবে যে তিনি গাজায় আক্রমণাত্মক নীতি নেবেন। উপদেষ্টা বলেন, ‘শুরুতে মনে হয়েছিল জামির সঠিক পথে আছেন। কিন্তু আশপাশের জেনারেলরা তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে এটি বেআইনি ও বিপজ্জনক।’
ইসরায়েলে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের সংঘাত নতুন নয়। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের আগে তরুণ জেনারেলরা প্রধানমন্ত্রী লেভি ইশকোলকে আরব প্রতিবেশীদের ওপর হামলার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা ‘জেনারেলদের অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত। এক দশক আগে মোসাদ ও আইডিএফ প্রধান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় নেতানিয়াহুর হামলার প্রস্তাব ঠেকান। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক ২০১৭ সালে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আপনার সেনাপ্রধানকে দরকার হবে। মন্ত্রিসভায় যেতে পারবেন না, যখন সেনাপ্রধান আপনাকে বলেন, ‘‘দুঃখিত, আমি আপনাকে না বলেছি।”’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতানিয়াহু ও সেনা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বেড়েছে। দক্ষিণপন্থীরা প্রায়ই সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য বা উদারপন্থী বলে সমালোচনা করেন। ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধের আগে গোয়েন্দা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা বিচারব্যবস্থা সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহু প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান এবং তাঁদের বরখাস্ত করেন।
একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা বলেন, এবার কিছু কর্মকর্তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে স্থায়ী ক্ষতি করছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এতে মার্কাভা ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানবাহনের ইঞ্জিনও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করছেন, সেনাবাহিনী সরকারের নির্দেশ মানবে, তবে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখবে। সরকার হয়তো লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, কিন্তু প্রতিটি খুঁটিনাটি ঠিক করতে পারবে না।
খবরওয়ালা/এন