খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার জামালপুর গ্রামে মেঘনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে গত ২২ আগস্ট একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প চালু করা হয়। মাত্র দুই দিন পর, ২৫ আগস্ট, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ওই ক্যাম্পে হামলা চালায়। তারা পুলিশের দিকে শতাধিক গুলি ও ককটেল ছোড়ে, যা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ঘটনার পর র্যাব অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে দুটি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে একটি পুলিশের বলে শনাক্ত হয়েছে, যা আগে থানা থেকে লুট হয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গিয়েছিল। র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান জানান, ‘উদ্ধারকৃত অস্ত্রের সিরিয়াল নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছিল, যাতে তা শনাক্ত করা না যায়।’
শুধু মুন্সিগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশের ওপর হামলা, খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে পুলিশের ওপর হামলা, থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়া, শত শত সাজাপ্রাপ্ত আসামির পলাতক থাকা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার চার শতাধিক আসামির জামিনে কারামুক্তি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার ও থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তর ও কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় লুট হওয়া ১,৩৭৬টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২,৬৫,১৩৪ রাউন্ড গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার হয়নি।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২,২৪৭ জন বন্দী কারাগার থেকে পালায়, যার মধ্যে ৭৪০ জন এখনও পলাতক। এদের মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার আসামি, মাদক কারবারি সহ গুরুত্বপূর্ণ আসামি রয়েছেন।
২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি-বি)’ সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন মো. ফয়জুর রহমান (৫৫)। সাত মাস জেলে থাকার পর ৬ আগস্ট জামিনে কারামুক্ত হন। একইভাবে, ‘হিযবুত তাহ্রীর’ মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে প্রচারমূলক পোস্টার লাগানোর চেষ্টা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার মো. আনোয়ার হোসেনও ৫ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার ৪২৬ জন আসামি জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ১১৭, ঢাকা বিভাগে ১০১, খুলনা ৮১, রংপুর ৬৮, রাজশাহী ৩৫, ময়মনসিংহ ১৭, সিলেট ৬ এবং বরিশাল ১ জন আসামি মুক্ত হয়েছেন।
থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট নয়। নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকায় সরকার অস্বস্তিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লুট হওয়া অস্ত্রের তথ্য দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশ। কারাগার থেকে পলাতক আসামি ও সন্ত্রাসীদেরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে বাকিদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান চলছে।’
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণে থাকা অস্ত্র যদি অপরাধীদের হাতে যায়, তা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি। অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে হারানো অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান জোরদার করতে হবে। না হলে নির্বাচনী পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে।’
খবরওয়ালা/শরিফ