ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ২১ মে ২০২৫
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের ঋষিঘাটে করতোয়া নদীর উপর একটি সেতুর অভাবে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নৌকাই হয়ে উঠেছে ৩০টিরও বেশি গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ প্রায় লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ঘাট দিয়ে নদী পারাপার হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঋষিঘাটটি পলাশবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং রানীগঞ্জ বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। করতোয়া নদী এই অঞ্চলের কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের চকবালা ও নলডাঙা তেকানি গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত। এ নদীই দুই পাশে বসবাসকারী মানুষদের যাতায়াতে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও এখানে নির্মিত হয়নি কোনো সেতু।
চকবালা, তেকানি, নলডাঙা, কাশিয়াবাড়ী, মুংলিশপুর, পালপাড়া, হাসানখোর, গণেশপুর, বড় শিমুলতলা, মিজারপুর, জাইতর, গণকপাড়া, বাগপাড়া, বোদর, বালুপাড়া, শ্যামপুর, চাঁদপাড়া, শিখনিপাড়া, দুর্গাপুর, রানীগঞ্জসহ প্রায় ৩০ গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে পার হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বেড়ে গেলে ঘাটে মানুষের দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নেয়।
নৌকা চলাচলে বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারে না। প্রতিদিন যেখানে ২০ মিনিটে পারাপার হওয়ার কথা, বর্ষায় সেখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়।
এই ঘাট দিয়ে কোনো রোগী হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক সময় রোগীর প্রাণহানিও ঘটে। বর্ষায় ঘাটে উপচে পড়া ভিড়, স্রোত ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌকা চলাচল আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে।
কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য যেমন ধান, শাকসবজি, আখ, চাল ইত্যাদি নৌকায় করে পার করে বাজারে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, অটোভ্যান এমনকি মাল বোঝাই ভ্যানও নদী পার করার সময় বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মন্টু মিয়া বলেন, ‘একটি সেতু হলে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও কেউ আমাদের কষ্ট বোঝেনি।’
মজিবর রহমান বলেন, ‘রোগী নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যায় না। অনেক কষ্টে জীবন চালাচ্ছি।’
কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘ঋষিঘাটে একটি সেতু আমাদের অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন। এই স্থানে একটি সেতু নির্মাণ হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে। আমি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে অনুরোধ করছি যেন দ্রুত একটি সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়।’
স্থানীয়দের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা এলেও কেউই এই ঘাটের সমস্যাটি সমাধানের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে ঋষিঘাটের অবস্থা যেন থেকে গেছে অবহেলিতই।
সেতুটি নির্মাণ হলে স্বল্প খরচে দ্রুত রানীগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, ওসমানপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এটি স্থানীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বড় অবদান রাখবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি মাত্র সেতুর অভাবে দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে দুর্ভোগে থাকা পলাশবাড়ীর ঋষিঘাট এলাকাবাসী উন্নয়নের আলো দেখার অপেক্ষায়। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের এই দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি কত দ্রুত বাস্তবায়ন করে।
খবরওয়ালা/আরডি