আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে কার্তিক ১৪৩২ | ১৭ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম খাল্লেত আল-ডাবা, যা মাসাফার ইয়াত্তার অন্তর্গত। মে মাসের এক সকালে গ্রামটির নীরবতা ভেঙে দেয় বুলডোজার ও ভারী যন্ত্রপাতির গর্জন। সঙ্গে ছিল ইসরায়েলি সেনারা। তারা ঘর থেকে লোকজনকে বের করে দেয়, গবাদি পশুগুলোকে ছেড়ে দেয় মাঠে।
ঘটনাটি ঘটে ৫ মে। একদিনের মধ্যেই খাল্লেত আল-ডাবার ফিলিস্তিনিদের ছোট একটি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। আলজাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী এমন চারটি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। স্থানীয়রা একে বলছেন ‘নতুন নাকবা’—১৯৪৮ সালের সেই নাকবার পুনরাবৃত্তি, যখন ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।
গ্রামবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসযজ্ঞ চলাকালে ডজনখানেক সেনা, সাঁজোয়া যান ও জিপ দিয়ে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলা হয়। নারী-শিশুসহ পরিবারগুলোকে প্রখর রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাদের চোখের সামনে নিজেদের ঘরবাড়ি ও পেছনের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় সেনারা।
বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো এখন টিকে থাকার নতুন উপায় খুঁজছে। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পুরনো গুহায়, কেউ আবার ভঙ্গুর তাঁবুতে বসবাস করছেন। শীত কিংবা গরম—উভয় মৌসুমেই এসব তাঁবুতে থাকা এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। পার্শ্ববর্তী আত-তুবানি গ্রামের কাউন্সিল প্রধান মোহাম্মদ রাবিয়া বলেন, ‘এই ঘটনায় খাল্লেত আল-ডাবার মানুষের জীবনের সব মৌলিক সুবিধা—পানি, বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি, কূপ, ময়লার পাত্র, এমনকি রাস্তার বাতিও ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা যেন প্রস্তরযুগে ফিরে গেছি, তবু কেউ গ্রাম ছাড়েনি।’
সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকা ও স্থানচ্যুতি নীতি
খাল্লেত আল-ডাবা পাহাড়ঘেরা ১২টি ফিলিস্তিনি গ্রামের একটি। জাতিসংঘের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসাফার ইয়াত্তায় প্রায় এক হাজার ১৫০ জন মানুষের বসবাস। তবে স্থানীয়দের মতে, বাস্তবে এখানে সাড়ে চার হাজারের মতো ফিলিস্তিনি বাস করেন। তারা মূলত ভেড়া পালন ও গম ও বার্লি চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।
১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েল এই এলাকার একটি অংশকে সামরিক প্রশিক্ষণ অঞ্চল ‘ফায়ারিং জোন ৯১৮’ ঘোষণা করে—যেমন পশ্চিম তীরের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিই সামরিক এলাকায় পরিণত করা হয়েছে। এরপর থেকেই শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুত করার প্রচেষ্টা। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আকেভট জানায়, ১৯৮১ সালে কৃষিমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের প্রস্তাবেই এ এলাকা সামরিক প্রশিক্ষণ অঞ্চলে রূপ নেয়। পরে তিনিই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন।
খাল্লেত আল-ডাবার ঘরবাড়ি বহুবার সামরিক নির্দেশে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়া নির্মাণ, সামরিক এলাকা সংলগ্ন বসতি বা অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন—সবকিছুর উদ্দেশ্য একটাই, ফিলিস্তিনিদের এলাকা থেকে উৎখাত করা।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)-এর কর্মকর্তা ফ্রেডেরিক ভ্যান ডোঙ্গেন বলেন, ‘মাসাফার ইয়াত্তায় ইসরায়েলের কার্যক্রম আসলে বৃহত্তর পরিসরে জাতিগত নির্মূল নীতির অংশ, যার উদ্দেশ্য এখানকার ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া।’
গুহা ধ্বংসের দৃশ্য
৬৫ বছর বয়সী সামিহা মুহাম্মদ আল-ডাবাবসেহ, জন্ম থেকে খাল্লেত আল-ডাবার বাসিন্দা, এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি জানান, ‘সেনারা কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ঘর থেকে টেনে বের করে দেয়। কিছুই নিতে দেয়নি—না খাবার, না পোশাক। আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলেছিল, এটা তোমার জমি নয়; এখানে তোমার ঘর থাকবে না।’
ঘর ধ্বংস হওয়ার পর সামিহা ও তার পরিবার আশ্রয় নেন একটি গুহায়, যা তারা নিজেরাই খুঁড়ে তৈরি করেছিলেন। নারীরা ও শিশুরা গুহার ভেতরে ঘুমাতেন, পুরুষরা বাইরে মাটিতে থাকতেন। কিন্তু গত ১৭ সেপ্টেম্বর সেই গুহাটিও ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী।
খবরওয়ালা/টিএসএন