খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
মুক্তিবাহিনী ও মিত্রশক্তির ধারাবাহিক আঘাতে পাকিস্তানি সেনারা তখন সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত ও পলায়নপর। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর এক বেতার ভাষণে বলেন, বাংলাদেশের ভাই-বোনেরা, সময় এসেছে একযোগে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রবল আঘাত হানার। এই শেষ আঘাতেই তাদের পতন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জনগণকে আহবান জানান, সব সম্ভাব্য উপায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। একইসঙ্গে সব শত্রুসৈন্য ও রাজাকারদের অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষ্যমতে, আত্মসমর্পণ করলেই তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের জীবন রক্ষা করতে পারে।
লেখক রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তাঁর ‘৭১ এর দশ মাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সেদিন সকালে আকাশবাণী আবারও ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ’র আত্মসমর্পণের আহবান প্রচার করে। আকাশে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন ভাষায় রচিত আত্মসমর্পণের বার্তাসংবলিত লিফলেট।
সে বার্তায় বলা হয়, চারদিক থেকে সম্মিলিত বাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘিরে ফেলেছে—এখনই আত্মসমর্পণ করুন।
এদিন কুমিল্লা পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত হয়। পাকিস্তানি সেনারা তখন ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়। কুমিল্লায় মুজিবনগর সরকারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জহুর আহমেদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট আহমদ আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা কুমিল্লায় উড়তে থাকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হিলি, সুনামগঞ্জ, ছাতক, লালমনিরহাট, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, আখাউড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যুদ্ধ চলে। ঢাকায় মিত্রবাহিনী সামরিক স্থাপনায় ১০ বার বিমান হামলা চালায়।
এর আগের দিন যশোরের মতো শক্তিশালী পাকিস্তানি ঘাঁটি পতনের পর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী একের পর এক সাফল্য অর্জন করে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সেদিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করে আশুগঞ্জের দিকে এগিয়ে যায়। বরিশাল ও পিরোজপুরও সেদিন হানাদারমুক্ত হয়।
১৯৭১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের বৈদেশিক সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ তাঁর প্রতিবেদনে যশোর পতনের উল্লেখ করেন। তাঁর প্রতিবেদনগুলো পরবর্তী সময়ে ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান’ নামে গ্রন্থে সংকলিত হয়। ৮ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে তিনি লেখেন “‘মুক্ত’ যশোরে বাঙালিদের নৃত্য”—তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে বাঙালিরা বাসের ছাদে নাচছিল, স্লোগান দিচ্ছিল এবং আনন্দে একে অপরকে আলিঙ্গন করছিল।
লেখক ও গবেষক মঈদুল হাসান তাঁর ‘মূলধারা ’৭১’ বইয়ে লিখেন, ৮ ডিসেম্বরের রণক্ষেত্র পাকিস্তানের জন্য আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানে ছম্ব অঞ্চলে তাদের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়; অন্যত্রও পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। রাজস্থান-সিন্ধু সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর প্রাধান্য দেখা যায় এবং করাচির ওপর নৌ ও বিমান হামলা চলতে থাকে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে পড়ে। যশোরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও পাক সেনারা পালিয়ে আসে। কুমিল্লার একাংশ পতনের মুখে পড়লে ভারত-বাংলাদেশের সম্মিলিত বাহিনী অন্য দিক দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। তবে এই পশ্চাৎপসরণের পর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার চারপাশে প্রতিরক্ষা গড়তে পারবে কি না, তা তখনও অনিশ্চিত ছিল।
সেদিন পাকিস্তান সরকার মনোনীত উপপ্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে যোগদানের জন্য নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং উপমহাদেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
খবরওয়ালা/এসএস