মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উত্তেজনার ফলে তেলের পাশাপাশি পানির সংকটও ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে তেল সরবরাহে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহ প্রভাব টেলির চেয়ে পানির উপর অনেক বেশি। পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যই পানির ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের পানি সংকটের বাস্তবতা
ইরান বিশ্বের সবচেয়ে পানি সংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটির নবায়নযোগ্য পানিসম্পদের প্রায় সব ব্যবহার হয়ে গেছে কৃষি, শিল্প ও গার্হস্থ্য কাজের জন্য। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের খরা, কম বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে ইরানের জলাধারগুলো বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে কয়েকটি প্রধান জলাধার প্রায় শূন্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের পানির ব্যবহার খাতে অবস্থার সংক্ষিপ্ত তথ্য নিচের টেবিলে দেওয়া হলো:
| ব্যবহার ক্ষেত্র | পানি ব্যবহার (% মোট) | প্রভাব |
|---|---|---|
| কৃষি | ৯০% | প্রধানত অদক্ষ সেচ ব্যবস্থার কারণে অপচয় |
| শিল্প | ৭% | তাপীয় ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীল |
| গার্হস্থ্য | ৩% | দৈনন্দিন জীবনের পানির চাহিদা |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। নদী সংকুচিত এবং হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক গ্রামীণ সম্প্রদায়কে শহরে স্থানান্তরিত হতে হচ্ছে। এতে সামাজিক অস্থিরতা এবং পরিবেশগত চাপ তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পানির ভূ-রাজনীতি
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পানিকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘কৌশলগত পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পারস্য উপসাগরের ১০ কোটি মানুষের অধিকাংশই সমুদ্রপানি থেকে খাবারযোগ্য পানি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান প্রধান। ইরানের হামলার কারণে এই অঞ্চলের ডেসালিনেশন প্লান্টগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের জুবাইল ডিস্যালিনেশন প্লান্ট দেশের ৯০% পানীয় জল সরবরাহ করে। ২০০৮ সালের উইকিলিকস স্মারকলিপি অনুযায়ী, এই প্লান্ট ছাড়া দেশের পানি ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে যেত। ইরানের সামরিক আক্রমণ বা দুর্ঘটনার কারণে যদি এই প্লান্টে ক্ষতি হয়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো মারাত্মক পানির সংকটের মুখোমুখি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত, তেলের দিক থেকে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা থাকলেও বাস্তব বিপদ হলো পানির। সামরিক সংঘাত ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার সমন্বয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র জ্বালানি নয়, বরং পানির নিরাপত্তার উপর নির্ভর করবে।
এভাবে, সামরিক উত্তেজনা এবং জলাধার ক্ষয় একসাথে চলে গেলে পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ জল-সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।



