পুশ ইন ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি অবস্থান স্পষ্ট করল দুই পক্ষ
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ভারত থেকে বাংলাদেশে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের অবস্থান আবারও স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়াকে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৫৭তম সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। চার দিনের এই সম্মেলনে সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে পুশ ইন, সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু, আহত ও নির্যাতন এবং চোরাচালান প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সূচি অনুযায়ী বুধবার উভয় পক্ষ সম্মত কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা করবে এবং বৃহস্পতিবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সম্মেলন শেষ হবে।
পুশ ইন সংক্রান্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়। এর মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। পাশাপাশি গত মে মাস থেকে সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে, এ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় পক্ষ আরও দাবি করেছে, অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত ও প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কয়েক হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
দুই পক্ষের অবস্থানের তুলনামূলক উপস্থাপন
বিষয়
বাংলাদেশের অবস্থান
ভারতের অবস্থান
পুশ ইন প্রক্রিয়া
অবৈধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী
নিজস্ব আইন ও প্রক্রিয়া অনুসারে ব্যবস্থা
নাগরিকত্ব যাচাই
নিশ্চিত না হয়ে কাউকে গ্রহণ নয়
বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়
তালিকা প্রদান
নাগরিকত্ব যাচাই অপরিহার্য
তালিকা দিলে দীর্ঘসূত্রতা হয় বলে দাবি
প্রত্যাবাসন সংখ্যা
সীমান্তে জোরপূর্বক প্রবেশের অভিযোগ
২,৮০০+ জন হস্তান্তরের দাবি
আলোচনায় উত্থাপিত অন্যান্য বিষয়
বৈঠকে বিএসএফ বাংলাদেশের কাছে অবৈধ ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার জন্য তালিকা দেওয়ার বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করে। তারা অভিযোগ করে, তালিকা দিলে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এর জবাবে বাংলাদেশ পক্ষ জানায়, নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে গ্রহণ করা সম্ভব নয় এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইন অনুসরণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ আরও অভিযোগ করে যে, রাতের অন্ধকারে সীমান্তে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। একই সঙ্গে সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার, অস্ত্র ও মাদক প্রবাহ, এবং ১৫০ গজ সীমান্ত এলাকায় অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় পক্ষ দাবি করে, অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত ও প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির অংশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব কার্যক্রমের প্রভাব সরাসরি সীমান্ত পরিস্থিতিতে পড়ছে এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
উপসংহারমূলক পর্যবেক্ষণ
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়মিত এই ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তবে পুশ ইন ইস্যুতে অবস্থানগত পার্থক্য এখনো স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। সম্মেলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে কার্যবিবরণী স্বাক্ষর এবং যৌথ বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে কিছু প্রক্রিয়াগত অগ্রগতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।