নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: 9শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ২৩ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, সহিংসতা ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের চিন্তা করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রাতে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি ওই রাতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
নাহিদ ইসলাম একটি গণমাধ্যকে জানান, “স্যার বললেন, আমি যদি কাজ করতে না পারি, তাহলে থাকাটা অর্থহীন। গণ-আকাঙ্ক্ষার পর আমাকে নিয়ে আসা হয়েছিল পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু এখন আমি কার্যত জিম্মি অবস্থায় আছি।” এসময় তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি যেন দৃঢ় থাকেন এবং পদত্যাগ না করেন।
আন্দোলন ও সহিংসতায় দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশেষ করে রাজধানীতে প্রতিদিনই চলছে বিক্ষোভ, লংমার্চ, অবস্থান কর্মসূচি ও রাস্তা অবরোধ। বিভিন্ন দাবিদাওয়ার মুখে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে গড়ে উঠছে মব, যারা কখনো কখনো সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালাচ্ছে। কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পর্যন্ত মবের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছে দাগী আসামী ও দুর্নীতিবাজরা। এসব ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টা নিজেও ক্ষুব্ধ এবং হতাশ বলে জানা গেছে।
নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-এনসিপি সংঘাত
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। দুই দলই অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন ‘যমুনা’ ঘেরাও করে লংমার্চ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে তারা। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ প্রকাশ্যেই প্রধান উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত গ্রহণে হস্তক্ষেপ করছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে রাজধানীতে তীব্র যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং দুষ্কৃতিকারীদের সক্রিয়তায় সরকার আরো চাপে পড়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে উসকানি, রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে
এনসিপির একাধিক নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনসেটিভ ও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতারা একে অপরের প্রতি পরস্পরবিরোধী ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছেন।
এদিকে মানবিক করিডর, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত অবকাঠামো বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে চলছে ধোঁয়াশা, বিতর্ক ও সমালোচনা। এসব ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ নাগরিকদের মাঝেও। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সাথেও সরকারের দূরত্ব বাড়ছে। ফলে বাড়ছে আস্থাহীনতা এবং সরকারবিরোধী মনোভাব। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবিশ্বাসের পরিবেশ রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপর জাতীয় ঐকমত্য গঠনের পথকে কঠিন করে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতার পথ না বেছে নেয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে কাজ করতে না দেয়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংকটজনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। পারস্পরিক অবিশ্বাস, দলীয় স্বার্থ এবং সংঘাতের রাজনীতি শাসনব্যবস্থাকে কার্যত জিম্মি করে তুলেছে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলো যদি অন্তর্বর্তী সরকারের উপর আস্থা না রাখে এবং সহনশীল সংলাপে না আসে, তবে নির্বাচন, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের জনগণের প্রত্যাশা—সব রাজনৈতিক শক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করবে এবং একটি অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করবে। অন্যথায়, অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
খবরওয়ালা/এমএজেড