প্রফেসর ড. মোহা: হাছানাত আলী
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ আগস্ট ২০২৫
বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ইতিহাসের প্রথম লিখিত চিহ্ন মহাস্থান শিলালিপির প্রাপ্তিস্থান থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান। ইতিহাসের আদি থেকে অন্ত একটি জেলার সঙ্গে সম্পর্কিত সেটি বগুড়া জেলা। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের এক প্রাচীন জনপদ, যার বুকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনের সুর একসাথে মিশে আছে। তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রদূত আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর বর্তমানে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার কণ্ঠস্বর তারেক রহমানের নামও মিলে মিশে একাকার হয়েছে এই জনপদের মোহনায়। ওদিকে এম আর আকতার মুকুল, ভাষা সৈনিক গাজিউল হক, খোরশেদ আলম, বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর নামও উচ্চারিত হয় মরিচ, আলু ঘাটি আর কলা-সবজি উৎপাদনের শীর্ষে থাকা এই জেলার নামের সঙ্গে।
ফ্যাসিবাদী শাসনের দাপটে বিপ্লবী বগুড়াবাসী বঞ্চিত হয়েছে আঠার বছর ধরে। এমনও হয়েছে কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ চাকরির আবেদন করলে শুধু বগুড়া জেলা দেখে যে কাউকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবখানা এমন যে, মুক্তিযুদ্ধের মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জেলায় জন্ম হওয়াটা তাদের আজন্ম পাপ। তাই খুব সম্ভবত বগুড়াই সে এলাকা-যেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকার পরেও অর্থনৈতিক জোন কিংবা ইপিজেড নাই। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে বগুড়া চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছে। পিছিয়ে পড়েছে উন্নয়ন থেকে। অন্যদিকে গত আওয়ামী শাসনামলে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস একাই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাতিঘর হিসেবে নিরবে কাজ করে গেছে। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এই জেলার নামের উৎসেই লুকিয়ে আছে এক টুকরো মধ্যযুগীয় কাহিনি। ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসিরউদ্দিন বগড়া খানের শাসনকাল (১২৮৭-১২৯১) এই জনপদের সাথে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর নামানুসারেই এর নাম হয়েছিল ‘বগড়া’, যা কালের প্রবাহে পরিবর্তিত হয়ে ‘বগুড়া’তে রূপান্তরিত হয়।
প্রাচীন ইতিহাসে বগুড়া ছিল পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের রাজধানী মহাস্থানগড়ের আধারভূমি একটি মহাকাব্যিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, যেখানে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে মানবসভ্যতার নিরবচ্ছিন্ন ধারা প্রবাহিত হয়েছে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মুসলিম সুলতান ও মুঘলরা সবাই এই ভূমিকে করেছে শাসন, আর রেখে গেছে সংস্কৃতির স্তরে স্তরে নানা চিহ্ন। মহাস্থানগড়ের প্রাচীরঘেরা নগর, গোকুল মেধের কিংবদন্তি বেহুলার বাসরঘর, ভাসু বিহারের বৌদ্ধ ধ্যানকুঞ্জ সবই যেন অতীতের আলোছায়া আজও ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঐতিহ্যের দিক থেকে বগুড়া শুধু স্থাপত্য বা পুরাকীর্তির ভান্ডার নয়, বরং এটি গ্রামীণ লোকজ মেলা, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। পোড়াদহ মেলা যেখানে বড় মাছ আর বড় মিষ্টির আহ্বান মানুষকে টানে; কলসদহের ঐতিহাসিক ঘোড়দৌড় যা শীতের দুপুরে গ্রামীণ জনপদের উচ্ছ্বাসকে আকাশছোঁয়া করে তোলে: খারুয়া মেলা যা তিন শতাব্দীর ঐতিহ্য নিয়ে এখনো জীবস্ত; আর আছে শীবের মেলা, কেল্লাপোষী মেলা সবই বগুড়াবাসীর সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রকাশ।
বগুড়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এক মিশ্র ঐতিহ্যের ভিতরে। উত্তরবঙ্গের মাটির মতোই এখানে জীবনযাত্রা সরল, আন্তরিক ও কৃষিনির্ভর। ধান, আলু, পাট, মরিচ, গম, সরিষা, কলা ও সবজির সুবাস এই জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। গ্রামীণ নারীদের হাতে গড়া পাটজাত দ্রব্য, হস্তশিল্প ও জালি কেবল দেশের বাজারেই নয়, বিদেশেও পৌঁছে দেয় বগুড়ার নাম। শিল্পক্ষেত্রে এই জেলা দেশের কৃষিযন্ত্র উৎপাদনের কেন্দ্র যেখানে তৈরি হয় সেচপাম্প, ধানমাড়াই যন্ত্র, ডিজিটাল স্কেল থেকে শুরু করে টিউবওয়েল পর্যন্ত। দেশের কৃষিযন্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা এখানেই পূরণ হয়, আর এর একটি বড় অংশ পাড়ি জমায় বিদেশে। কিন্তু বগুড়ার জীবন শুধুই কৃষি ও শিল্পের চাকা ঘুরিয়ে চলে না: শিক্ষার আলোকেও এই জেলা উজ্জ্বল। সরকারি আজিজুল হক কলেজের দীর্ঘ ঐতিহ্য, বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র, এবং অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এই জেলার মানুষকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলোকিত করছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা যেমন রাজধানীর খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে, তেমনই বিদেশেও গিয়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে আসে।
বগুড়ার নগরজীবনও বহুমুখী। সড়ক, রেল ও আকাশপথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা একে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার করেছে। ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব জেলায় যাতায়াতের পথে বগুড়া এক অপরিহার্য সংযোগস্থল। শহরের কেন্দ্রস্থলে আছে চারমাথা, রানার প্লাজা, পুলিশ প্লাজা, মম-ইন হোটেল, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক যা আধুনিক জীবনযাত্রার স্বাদ এনে দেয়। এই জেলার চিত্রকলা ও সাহিত্যেও আছে নিজস্ব স্বাক্ষর।
বগুড়ার জনজীবনে ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা আজও টিকে আছে। এখানকার মানুষ অতিথিপরায়ণ, মাটির মতোই বিনয়ী, আর প্রাণখোলা হাসিতে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। নদীর পাড়, ধানখেত, গ্রামীণ হাট, চায়ের দোকান সবখানেই আছে গল্পের স্রোত, যা এই জেলার প্রাণচিত্রকে করে তোলে জীবন্ত। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর জীবনের এই সমন্বয় বগুড়াকে করেছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমেরএক অমূল্য রত্ন। মহাস্থানগড়ের ধূসর প্রাচীর থেকে পোড়াদহ মেলার রঙিন আবেশ, কৃষিজমির সোনালি ধান থেকে শিল্পকারখানার ধাতব শব্দ সব মিলিয়ে বগুড়া এক জীবন্ত মহাকাব্য, যা অতীতকে বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে আগামী দিনের পথে। বগুড়ার গর্ব মহাস্থানগড় পুন্ড্র বর্ধন রাজ্যের রাজধানী, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের প্রাচীন নগর। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন প্রতিটি যুগ এই মাটিতে রেখেছে নিজস্ব ছাপ। গোকুল মেধের কিংবদন্তি “বেহুলার বাসরঘর”, ভাসু বিহারের ধ্যানমগ্ন স্তূপ, শীলাদেবীর ঘাটের নদীজীবন সবই যেন ইতিহাসের জ্যোতিষ্মান প্রতিচ্ছবি।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
খবরওয়ালা/এমএজেড