বিশ্বসংগীতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী নাম কলম্বিয়ার জনপ্রিয় গায়িকা, গীতিকার ও নৃত্যশিল্পী শাকিরা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লাতিন মিউজিককে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির মূলধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তবে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় এবং অনন্য পরিচয়গুলোর একটি হলো—ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করা স্মরণীয় সব থিম সং বা অফিশিয়াল গান।
বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরার সম্পৃক্ততার ইতিহাস
ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরার উপস্থিতি শুরু হয় ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ দিয়ে। সেই আসরের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি পারফর্ম করেছিলেন। যদিও সেটি বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ছিল না, তবুও সেই পরিবেশনা বিশ্বমঞ্চে তাঁর উপস্থিতির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।
এর ঠিক পরের আসরে অর্থাৎ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপে শাকিরার ক্যারিয়ারে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়। সেই আসরের অফিশিয়াল গান ছিল ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’, যা তিনি দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যান্ড ‘ফ্রেশলিগ্রাউন্ড’-এর সঙ্গে যৌথভাবে গেয়েছিলেন। এই গানটি কেবল বিশ্বকাপের থিম সং হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সফল স্পোর্টস অ্যান্থেম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে শাকিরার অনবদ্য পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্বকাপের একটি স্থায়ী প্রতীকে পরিণত করে। গানটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কপি বিক্রি হয় এবং আন্তর্জাতিক চার্টলিস্টের শীর্ষে উঠে আসে। আজ পর্যন্ত ‘ওয়াকা ওয়াকা’ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ও সর্বাধিক দেখা গানগুলোর একটি।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে শাকিরা তাঁর দ্বিতীয় অফিশিয়াল গান ‘লা লা লা’ নিয়ে হাজির হন। এর বাইরে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও অফিশিয়াল গান না গাইলেও উদ্বোধনী ও প্রমোশনাল পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিভিন্ন বিশ্বকাপে শাকিরার সম্পৃক্ততার বিবরণী
নিচে টেবিলের মাধ্যমে বিভিন্ন বছরের ফিফা বিশ্বকাপে শাকিরার ভূমিকা ও গানের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
| বিশ্বকাপের বছর | আয়োজক দেশ | গানের নাম / ভূমিকা | ধরন |
| ২০০৬ | জার্মানি | ফাইনাল অনুষ্ঠানে পারফরম্যান্স | অফিশিয়াল থিম সং ছিল না |
| ২০১০ | দক্ষিণ আফ্রিকা | ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’ | অফিশিয়াল থিম সং (ইতিহাসের অন্যতম সফল) |
| ২০১৪ | ব্রাজিল | ‘লা লা লা’ | শাকিরার কণ্ঠের দ্বিতীয় অফিশিয়াল গান |
| ২০১৮ | রাশিয়া | উদ্বোধনী ও প্রমোশনাল পারফরম্যান্স | অফিশিয়াল গান ব্যতীত সম্পৃক্ততা |
| ২০২৬ | যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা | ‘দাই দাই’ (বার্না বয়-এর সঙ্গে যৌথ) | ২০২৬ আসরের অফিশিয়াল থিম সং |
সঙ্গীত জগতে যাত্রা, উত্থান ও বর্তমান অবস্থান
শাকিরার জন্ম ১৯৭৭ সালে কলম্বিয়ার বারানকিয়ায়। তাঁর পুরো নাম শাকিরা ইসাবেল মেবারাক রিপোল। ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা লেখা ও গান তৈরির প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন এবং অল্প বয়সেই কাজ শুরু করেন। তবে তাঁর শুরুর পথটি মসৃণ ছিল না; তাঁর প্রথম দুটি অ্যালবাম বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেনি। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি গান থমকে দেননি। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর ‘Pies Descalzos’ অ্যালবামটি তাঁকে লাতিন আমেরিকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং একজন সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এরপর ২০০১ সালে ‘Whenever, Wherever’ গানটির মাধ্যমে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে বা বিশ্বপর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘Hips Don’t Lie’ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক হিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময় থেকেই শাকিরা লাতিন মিউজিককে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির মূলধারায় একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যান।
বর্তমানে শাকিরা শুধু একজন গায়িকা নন, বরং একটি বৈশ্বিক আইকন। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেও তিনি নতুন গান ও পারফরম্যান্স নিয়ে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। চলমান এই বিশ্বকাপের জন্য প্রকাশিত তাঁর নতুন অফিশিয়াল থিম সং-এর নাম ‘দাই দাই’। গানটি তিনি নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় আফ্রো-বিটস শিল্পী বার্না বয়-এর সঙ্গে যৌথভাবে গেয়েছেন। এই গানটিতে মূলত আফ্রো-বিটস এবং লাতিন পপের একটি চমৎকার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে, যা এবারের বিশ্বকাপের মূল প্রতিপাদ্য ‘গ্লোবাল ইউনিটি’ বা বৈশ্বিক ঐক্যকে তুলে ধরে। গানের কথা ও সুরে ফুটবল উন্মাদনা, বিভিন্ন দেশের নাম এবং উৎসবমুখর আবহ তৈরি করা হয়েছে, যা স্টেডিয়ামের দর্শকদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা যোগাচ্ছে। বিশ্বকাপের সঙ্গে শাকিরার এই দীর্ঘমেয়াদী পথচলা সংগীতের ইতিহাসের পাশাপাশি তাঁকে ক্রীড়াবিশ্বে ‘ফুটবলের সুর’ হিসেবে এক অনন্য ও আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।



