খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযাত্রা আজ শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। পেলে, গারিঞ্চা, ম্যারাডোনা, জিদান কিংবা মেসির মতো কিংবদন্তিদের হাত ধরে এই টুর্নামেন্ট বিশ্ব ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আসরে পরিণত হয়েছে। ফুটবল ইতিহাসের এই সমৃদ্ধ অধ্যায়ে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ফুটবলের জনক হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ডের বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে দীর্ঘ ৩৬ বছর সময় লেগেছিল। অবশেষে ১৯৬৬ সালে স্যার আলফ রামসের ‘উইংলেস ওয়ান্ডারস’ খ্যাত দলটির হাত ধরে ফুটবল তার ঘরে ফেরে। তবে স্বাগতিকদের সেই একমাত্র বিশ্বজয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ২-২ সমতায় শেষ হলে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। ম্যাচের ১০১ মিনিটে ঘটে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাটি। ইংলিশ স্ট্রাইকার জিওফ হার্স্টের একটি জোরালো শট জার্মানির ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ওপর বা সামান্য সামনে ড্রপ খেয়ে মাঠে ফিরে আসে। জার্মান ডিফেন্ডাররা বলটি ক্লিয়ার করলেও সুইস রেফারি গটফ্রিড ডিনস্ট লাইন্সম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে এটিকে ‘গোল’ হিসেবে ঘোষণা করেন। জার্মানির তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও সিদ্ধান্তটি বহাল থাকে। পরবর্তীতে হার্স্ট আরও একটি গোল করে বিশ্বকাপে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। তবে এই গোলটি নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
এই বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইউরোপীয় রেফারিদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের তীব্র অভিযোগ আনা হয়েছিল। ম্যাচের রেফারি নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা লক্ষ্য করা যায়, যা নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ম্যাচের বিবরণ | নিযুক্ত রেফারি ও তাঁর দেশ | ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও ঘটনা |
|
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা (কোয়ার্টার ফাইনাল) |
রুডলফ ক্রেইটলেইন (পশ্চিম জার্মানি) |
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে লাল কার্ড দেখানো হয়। রেফারির ভাষ্যমতে, রাত্তিনের তাকানোর ভঙ্গি তাঁর ভালো লাগেনি। |
|
পশ্চিম জার্মানি বনাম উরুগুয়ে (কোয়ার্টার ফাইনাল) |
জেমস ফিনি (ইংল্যান্ড) |
উরুগুয়ের দুজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেওয়া হয়। এছাড়া জার্মান ডিফেন্ডার কার্ল-হাইঞ্জ শ্নেলিঙ্গার গোললাইনে হাত দিয়ে বল আটকালেও রেফারি তা এড়িয়ে যান। |
|
পর্তুগাল বনাম ব্রাজিল (গ্রুপ পর্ব) |
জর্জ ম্যাককেব (ইংল্যান্ড) |
পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের ক্রমাগত ফাউলের শিকার হয়ে চোট পেয়ে পেলেকে মাঠ ছাড়তে হয়। রেফারি ফাউলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেননি এবং ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। |
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ডই একমাত্র চ্যাম্পিয়ন দল, যারা তাদের টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ একই শহরের একই মাঠে (লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে) খেলার সুযোগ পেয়েছিল। যদিও ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে তাদের সব ম্যাচ মন্টেভিডিওতে খেলেছিল, তবে সেবার সমস্ত দলের জন্যই নিয়ম অভিন্ন ছিল। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের মধ্যকার সেমিফাইনাল ম্যাচটি প্রথমে লিভারপুলে হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ফিফা সচিব হেলমুট ক্যাসারের প্রচ্ছন্ন ইশারায় তা ওয়েম্বলিতে স্থানান্তরিত করা হয়। অধিক দর্শক ধারণক্ষমতার যুক্তি দেওয়া হলেও, ঘরের মাঠে এমন বিশেষ সুবিধা অন্য কোনো দল কখনো পায়নি।
১১ জুলাই উরুগুয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হতে কয়েক মিনিট বিলম্ব হয়েছিল। এর কারণ ছিল ইংল্যান্ডের সাতজন ফুটবলার নিজেদের পরিচয়পত্র হোটেলেই ফেলে এসেছিলেন। পরবর্তীতে এক পুলিশ অফিসার মোটরসাইকেলে করে লন্ডনের যানজট পেরিয়ে হোটেল থেকে আইডি কার্ডগুলো উদ্ধার করে আনলে ববি চার্লটনরা মাঠে নামার অনুমতি পান। ম্যাচটি অবশ্য ০-০ গোলে ড্র হয়েছিল।
ফুটবল মাঠে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত হলুদ ও লাল কার্ডের ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল এই ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা ম্যাচের উত্তপ্ত পরিস্থিতি থেকে। ম্যাচটিতে ভাষার দূরত্বের কারণে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন যখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন, তখন রাত্তিন তা বুঝতে পারছিলেন না। ক্ষুব্ধ রাত্তিন মাঠ ছাড়ার সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারের লালগালিচায় বসে পড়েন এবং কর্নার পতাকায় হাত মোছেন।
এই ম্যাচটি ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে জিতলেও মাঠের বাইরে রেফারি কেন অ্যাস্টন ভাষার এই জটিলতা দূর করার উপায় নিয়ে ভাবছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল ও হলুদ আলো দেখে তাঁর মাথায় বিশ্বজনীন এই কার্ড ব্যবহারের আইডিয়া আসে। তাঁর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথম অফিশিয়ালি লাল ও হলুদ কার্ডের প্রবর্তন করা হয়।
১৯৬৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর খাদ্যতালিকায় ব্যাপক বৈচিত্র্য ও নিজস্ব সংস্কৃতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। পর্তুগিজ দল চেশায়ারের উইমসলো হোটেলের বেজমেন্টে তাদের নিজস্ব ৬০০ বোতল ওয়াইন, অলিভ অয়েল এবং প্রচুর পরিমাণে মাছ মজুত করেছিল। অন্যদিকে হাঙ্গেরি দলের সেক্রেটারি গিওর্গি হন্টি গরুর মাংসকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির খাবার’ আখ্যা দিয়ে খেলোয়াড়দের পাতে তা পরিবেশন নিষিদ্ধ করেছিলেন।
চিলির ফুটবলাররা নিউক্যাসলের হোটেলে পৌঁছালে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে এক বোতল করে স্কচ হুইস্কি উপহার দেওয়া হয়। পশ্চিম জার্মানির খেলোয়াড়দের জন্য প্রতিদিন সকালে বিমানযোগে জার্মানি থেকে তাজা রুটি ও বেকন আসত। মেক্সিকোর কঠোর কোচ ইগনাশিও ত্রেলেস খেলোয়াড়দের জন্য মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন এবং পুরো লন্ডন শহর খুঁজে খেলোয়াড়দের জন্য ছাগলের দুধের ব্যবস্থা করান।
উরুগুয়ের ফুটবলাররা শক্তির উৎস হিসেবে কার্টুন চরিত্র ‘পপাই’-এর মতো প্রচুর পরিমাণে পালংশাক আর ডিমের কেক খেতেন। ফ্রান্স দল নিজেদের জন্য এক হাজার বোতল ওয়াইন সঙ্গে এনেছিল, যদিও প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেওয়ার কারণে তারা কেবল খালি বোতলগুলোই লন্ডনে রেখে যায়। স্পেনের কোচ হোসে ভিয়ালঙ্গা চারজনের টেবিলে মাত্র এক বোতল ওয়াইন বরাদ্দ করেছিলেন। আর্জেন্টিনার কোচ হুয়ান কার্লোস লরেঞ্জো প্রতি বেলা খাবারে মাত্র এক গ্লাস ওয়াইন পানের অনুমতি দিতেন, তবে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার রাতে তিনি আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ছেলেদের দুই গ্লাস রেড ওয়াইন পানের অনুমতি দিয়েছিলেন।
ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচের দিন গ্যালারিতে দর্শকদের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের পরিমাণও ছিল বিপুল। সেদিন ২০ হাজার স্যান্ডউইচ, ৪ হাজার ক্যান বিয়ার, ২০ হাজার কাপ চা এবং ৫০০ বোতল হুইস্কি বিক্রি হয়েছিল।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ব্রাজিলের সালভাদর দে বাহিয়ার এক তান্ত্রিক ঘোষণা করেছিলেন যে, ব্রাজিল যদি এবার টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিততে না পারে, তবে তিনি আত্মহত্যা করবেন। তবে পর্তুগালের কাছে ৩-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিদায় ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই সেই তান্ত্রিক জনরোষ ও বাজি ধরার অর্থ ফেরত দেওয়ার ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ওদিকে ব্রাজিলে এই পরাজয়ের শোকে এক সমর্থক আত্মহত্যা করেন এবং এক পর্তুগিজ ব্যবসায়ী আনন্দ উদ্যাপন করার কারণে ক্ষুব্ধ ব্রাজিলীয় জনতার প্রহারের শিকার হন।