ফেসবুকের জাল টিকিট চক্রের হোতা গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কালোবাজারি ও জালিয়াতি রোধে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গ্রুপ খুলে ট্রেনের ভুয়া টিকিট বিক্রির অভিযোগে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম মো. নওশাদ জাহেদ ওরফে নয়ন (৩৭)। সোমবার সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পার্কিং এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রতারণার কৌশল

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৮ মার্চ ইস্টার্ন ব্যাংকের কল্যাণপুর শাখার ব্যবস্থাপক সুকান্ত কুমার কুণ্ডু সপরিবারে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ‘রেল সেবা’ অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট কাটার চেষ্টা করেন। ২৮ মার্চ কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের টিকিট পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি কমলাপুর স্টেশনের কাউন্টারেও যোগাযোগ করেন। সেখান থেকেও কোনো টিকিট না পেয়ে তিনি বিকল্প উপায়ের সন্ধান করেন।

একপর্যায়ে ‘ট্রেনের টিকিট ক্রয়-বিক্রয় বিশ্বস্ত গ্রুপ’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে নওশাদ জাহেদের সন্ধান পান তিনি। টিকিট নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়ন তার কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে মোট ৬ হাজার ৭০০ টাকা হাতিয়ে নেয় এবং ইমেইলের মাধ্যমে তিনটি টিকিট সরবরাহ করে। তবে ভ্রমণের দিন ট্রেন ছাড়ার পর কর্তব্যরত টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) টিকিটগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোকে ভুয়া বা জাল হিসেবে শনাক্ত করেন। এতে পর্যটন নগরী থেকে ফেরার পথে ওই যাত্রীকে চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।

আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তার

ভুক্তভোগী সুকান্ত কুমার কুণ্ডু ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তদন্তে নেমে প্রযুক্তির সহায়তায় এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ১ নম্বর টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন পার্কিং এলাকা থেকে অভিযুক্ত নওশাদ জাহেদকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জাল টিকিট তৈরির কথা স্বীকার করেছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে এবং আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

রেলওয়ে টিকিটিং ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্যাবলি

ভ্রমণকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত কিছু নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। নিচে টিকিট ক্রয়ের নিয়ম ও জালিয়াতি এড়ানোর উপায়সমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় সঠিক নিয়ম ও করণীয় সর্তকতা
টিকিট সংগ্রহের মাধ্যম শুধুমাত্র ‘রেল সেবা’ অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং অফিশিয়াল কাউন্টার। ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার বা অপরিচিত ব্যক্তির থেকে টিকিট কেনা নিষেধ।
মূল্য পরিশোধ অ্যাপের গেটওয়ে বা কাউন্টারে সরাসরি অর্থ প্রদান। ব্যক্তিগত বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিচয় যাচাই ‘টিকিট যাঁর, ভ্রমণ তাঁর’ নীতি অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার। অন্যের নামে কেনা টিকিটে ভ্রমণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
টিকিট যাচাই কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করে সঠিকতা নিশ্চিত করা। হাতে লেখা বা অস্পষ্ট পিনযুক্ত টিকিটে জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে।

কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা

ঢাকা রেলওয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুক মিয়া এই অভিযান প্রসঙ্গে জানান, ট্রেনের টিকিট কোনো হস্তান্তরযোগ্য পণ্য নয়। বর্তমানে প্রত্যেক যাত্রীর এনআইডি (NID) তথ্যের ভিত্তিতে টিকিট ইস্যু করা হয়। তিনি আরও বলেন:

“অসাধু চক্রগুলো ফেসবুক গ্রুপ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। অন্যের এনআইডি দিয়ে কেনা টিকিট বা দালালের মাধ্যমে সংগ্রহ করা টিকিট নিয়ে রেলভ্রমণ দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা এই কালোবাজারি ও জালিয়াত চক্র নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি।”

রেলওয়ে পুলিশ সাধারণ জনগণকে অপরিচিত প্ল্যাটফর্ম থেকে আর্থিক লেনদেন না করার অনুরোধ জানিয়েছে। যদি কেউ এমন প্রতারণার শিকার হন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ রেলওয়ে পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখতে সরকার টিকিট ব্যবস্থার যে আধুনিকায়ন করেছে, তার সুফল পেতে জনসাধারণের সচেতনতা অপরিহার্য।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।