খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পূর্বেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত ঘোষণা করায় গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। ২০ মে ২০২৬, বুধবার সকালে বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে বিলুপ্তির সরকারি প্রজ্ঞাপনটি উপস্থাপন করা হলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন, ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর রিটকারী পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির গণমাধ্যমকে জানান, আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় সচিবালয় বিলুপ্তির এই সিদ্ধান্ত আদালত অবমাননার শামিল। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) তিনি নিজেই আদালতে একটি অবমাননার আবেদন (Contempt Application) দায়ের করবেন। আইনজীবী শিশির মনির আরও যোগ করেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার মতো এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
এর আগে, গত ১৯ মে ২০২৬ (মঙ্গলবার) এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে উক্ত সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে (বিচারক) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, দেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন করার লক্ষ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার এসে অধ্যাদেশটি বাতিল ঘোষণা করে।
অধ্যাদেশ বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে, হাইকোর্ট বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পক্ষে রায় দেন এবং রায় ঘোষণার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে নির্দেশ প্রদান করেন।
হাইকোর্টের উক্ত নির্দেশনার পর রাষ্ট্রপক্ষ (সরকার) এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আপিল দায়ের করেনি। আইনি প্রক্রিয়াটি এই পর্যায়ে থাকাকালীনই হাইকোর্ট বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের কাছে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন যেন মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমে কোনো রূপ হস্তক্ষেপ বা তা বন্ধ করা না হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করেই বিচারকদের মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে সচিবালয়টি বিলুপ্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সময়পঞ্জি নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | ঘটনার বিবরণ / আইনি পদক্ষেপ | সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ / পক্ষ | বর্তমান স্থিতি |
| ১. | বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি। | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার | পরবর্তীতে বাতিল করা হয়। |
| ২. | সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলকরণ। | বিএনপি সরকার | অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। |
| ৩. | রিটের প্রেক্ষিতে ৩ মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ। | হাইকোর্ট বিভাগ | রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সিদ্ধান্ত নেয় (এখনো দায়ের হয়নি)। |
| ৪. | ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সচিবালয় বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন। | রাষ্ট্রপক্ষ (সরকার) | ১৯ মে ২০২৬ তারিখে কার্যকর করা হয়। |
| ৫. | চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে বিলুপ্তিতে বিস্ময় প্রকাশ ও অবমাননা আবেদনের ঘোষণা। | হাইকোর্ট ও আইনজীবী শিশির মনির | ২০ মে ২০২৬ তারিখে আদালতে আলোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ। |
মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও সরকারের এই আকস্মিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যকার আইনি ভারসাম্যকে নতুন বিতর্কের মুখে ফেলেছে। বৃহস্পতিবার আদালত অবমাননার আবেদনটি দায়েরের পর এই বিষয়ে পরবর্তী আইনি দিকনির্দেশনা জানা যাবে।