মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: 10শে বৈশাখ ১৪৩২ | ২৩ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন – ‘অহংকার ও দাম্ভিকতা হলো এক ধরনের ঝড় যা সবকিছুকে ধ্বংস করে।’ তার প্রমাণ আমরা বিগত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে আমাদের দেশেই দেখেছি। এর ফলে একদম ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাও বাস্তব জীবন থেকে স্বৈরাচার, একনায়কতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, বিপ্লব ইত্যাদি শব্দগুলোর মর্মার্থ অনেকটা শিখতে পেরেছে।
দেশের শাসনব্যবস্থায় সরকারের সকল ক্ষমতা কোন একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে তিনি কীভাবে ক্রমশ নিজ দল ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষমতাচ্যুত করে নিজ কর্তৃত্ব ও প্রাধান্যকে দৃঢ় ও নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে অবাধ ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী হন এবং মানুষের ওপর ক্রমাগতভাবে জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে তাদেরকে দমন করতে গিয়ে একটা পর্যায়ে কি ধরনের রুদ্ররোষের স্বীকার হয়ে চরমভাবে পরাজিত ও অপমানিত হয়ে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন – বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী ও আপামর ক্ষুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করে দেখিয়েছে। এই উদাহরণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যতে হয়ত উপমা হিসেবে হয়ত পড়ানো হবে।
স্বৈরতান্ত্রিক এরকম শাসনব্যবস্থায় মোসাহেব-সংস্কৃতির আগ্রাসন মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। চাটুকারিতা ও তোষামোদির কোনো প্রসঙ্গ এলেই তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতার বিখ্যাত সেই লাইনটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’ মনে পড়ে নজরুলের ‘সাহেব ও মোসাহেব’ কবিতাটার কথা। তেল মারায় ব্যস্ত মোসাহেবের যে চরিত্র নজরুল এঁকেছেন, তাঁকে বোধ করি আর কোনো শিল্পী ছাড়িয়ে যেতে পারেননি।-
“সাহেব কহেন, ‘চমৎকার! সে চমৎকার!’
মোসাহেব বলে, ‘চমৎকার সে হতেই হবে যে!
হুজুরের মতে অমত্ত কার?…।
একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থা যা মূলত ফ্যাসিবাদ নামে অভিহিত যেখানে এ ধরনের শাসককে টিকিয়ে রাখতে তার নিজ দলের ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার একটা সুবিধাবাদি মোসাহেবি গোষ্ঠী বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। এই গোষ্ঠী সম্পদ ও ক্ষমতার উপরে শাসকের অনুগামী হিসেবে একচেটিয়াভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে ক্রমাগতভাবে মিথ্যা প্রচারণায় জড়িয়ে পড়ে, ভিন্ন মতকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারেনা, তাদের বিরোধিতাকারীদের ওপর চরম দমন-পীড়ন চালায়, মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমায় অথবা কোন কারণ ছাড়াই নিরীহ মানুষকেও গুম, খুন করে ফেলে। বড় রকমের সাজা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে বাকিদেরকে ভয় দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। কিন্তু একটা সময় ধৈর্যের সীমা অতিরিক্ত হতে হতে সীমা ছাড়িয়ে গেলে তার পরিণতি কি হয়, গেলো বছরের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া বিদায়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রবীণ-নবীন নেতাদের ফ্যাসিস্ট কায়দায় দেশ পরিচালনায় যে ভয়ংকর, প্রতিশোধ পরায়ণ ও চরম ঔদ্ধত্যমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে আমরা দেখেছি, একইসাথে জ্ঞানপাপী তথাকথিত কিছু সুশীল (!) বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ও বিশেষত টিভি মিডিয়ার টকশোতে এসে যেভাবে স্বৈরতন্ত্রের দোসর হয়ে অবিবেচকের মত বছরের পর বছর ধরে কাজ করে গেছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সেই বিজয়লগ্ন থেকেই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবার মত আমিও তাদের সকলকে বিচারের কাঠগড়ায় দেখতে চাই। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমি আমার দেখা স্বৈরাচারী ও সদ্য বিদায়ী এই পলাতক সরকারের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে এসে দালালি করা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার এ সকল ব্যক্তিদেরকে তাদের এমন ন্যাক্কারজনক ভূমিকার জন্য তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাই। কারণ, তারা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা নিয়ে কাজ করা সকলকেই অপমানিত করেছেন।
এবার আসা যাক এই আন্দোলন-সংগ্রাম পরবর্তী বাংলাদেশের অবস্থা নিয়ে। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে শেষের দিকে এসে দেশের সকল পর্যায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শুধু ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে এমনটা কখনো মনে হয়নি। এই আন্দোলন সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট, গণতন্ত্রহীন নৈরাজ্য, ক্ষমতার অসহনীয় দাপট, অন্ধকার যুগের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বাধীন দেশকে অন্য দেশের শাসনের নিগড়ে বেঁধে দেওয়া ইত্যাদি শতেক বহুমুখী কারণে সংঘটিত হয়েছিল। এতে ছাত্র-জনতাসহ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত, দমন-পীড়নে নিষ্পেষিত রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাকেও খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
এমন একটা বিজয় আসার পরও সে সময় থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনভিজ্ঞ নেতাদের মধ্যে কারও কারও অপরিপক্ব বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের অপরিপূর্ণতা এই অর্জনকে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে সকল কৃতিত্ব নিজেদের এই ছত্রিশ দিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেখানোর প্রবণতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিগত পনেরো বছর এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনেকটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলার বিষয়টা দেশের স্বার্থে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদরা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না।
উপরন্তু, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে এসব ছাত্ররা মূল ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাদের একাধিক প্রতিনিধি সরকারের অংশ হয়ে গিয়ে যেমন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, আবার এই অবস্থায় থেকে তারা যেভাবে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, রাজনৈতিক নয়া বন্দোবস্তের কথা বলে গতানুগতিক ধারায় প্রচুর অর্থ খরচ করে বিশাল পরিসরে প্রচুর জনসমাগম করে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন ও হোটেলের দামী স্যুইটগুলো মাসের পর মাস নিয়ন্ত্রণ করে রাখার যে অভিযোগ গণমাধ্যম সূত্রে আমরা শুনছি, একাধিক দামি ও বিলাসবহুল গাড়িতে তাদের সার্বক্ষণিক চলাফেরা করা, এসকল ছাত্র নেতাদের হঠাৎ করে ঐশ্বর্যময় জীবনযাপন ছাড়াও শুধু রাজনৈতিক শোডাউন আর বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা বলে যাওয়া, টিভির টকশোগুলোতে পুরাতন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে তাদের ক্রমাগত অসৌজন্যমূলক আচরণ, ঢাকার কেন্দ্রস্থল বাংলামোটরে আধুনিক ও ব্যয়বহুল সুউচ্চ ভবনে তাদের বিশাল আধুনিক অফিস ও এসবের ব্যয়ভারের উৎস নিয়ে সুস্পষ্ট কোন জবাবদিহিতা না দেয়া, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে শুরু থেকেই তাদের খুব বেশি মাখামাখি ও প্রায় একই সুরে কথা বলা – এরকম অনেক কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে দিনদিন আশাভঙ্গের কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে!
সেইসাথে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ক্রান্তিকালীন এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অধ্যপক ইউনুসের দায়িত্বশীল ভুমিকায় দেশের বেশিরভাগ মানুষ আশাবাদী হতে চাইলেও নির্বাচন ইস্যুতে একেকসময় একেক ধরনের বার্তা দেয়া, দেশে থাকা গুণী ব্যক্তিদেরকে বাদ দিয়ে বিদেশি পাসপোর্টধারীদেরকে দেশে নিয়ে এসে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করা, তার সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের একাদিক্রমে একেকরকম বক্তব্যের মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা, মব রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে ক্রমাগত উদাসীনতা বা ব্যর্থতা দেখানো – এরকম অনেক বিষয় নিয়ে জনমনে নানা ধরনের সংশয়ের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে! এর সাথে দিন দিন যুক্ত হচ্ছে বিনাভোটে তাদের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় জেঁকে বসার দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার কথাও। এ সময়ে এসেও আমরা দেখছি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলের মতো দেশ-বিদেশ থেকে জ্ঞানপাপী তথাকথিত কিছু সুশীল ও ইউটিউবাররাও এ সরকারকে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য নানারকম গল্প বানিয়ে তাদের কিছু অনুগামীদের দিয়ে সকলের শ্রদ্ধাভাজন প্রধান উপদেষ্টার শাসনামলকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন!
আমেরিকার তৃতীয় রাষ্ট্রপতি থমাস জেফারসন বলেছিলেন ‘যদি অন্যায় কখনো আইন হয়ে দাঁড়ায়, তবে মানুষের জন্য তা অমান্য করা শুধু ঠিকই না, বরং একটি কর্তব্যও বটে।’ বর্তমান এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতা-কর্মী, চামচা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পদস্থ কর্মকর্তাদের নানারকম ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে তাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ পথে নেমে এসেছিল। এই নেমে আসাটা ছিল কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, একান্তই মানবিক ও নাগরিক কর্তব্য মনে করেই। যা থেকে ক্ষমতালোভী সকল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী শিক্ষা গ্রহণ না করলে তার পরিণতি কি হবে তা সময়ই বলে দেবে। আমরা সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করতে চাই – সময় আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে আঁধার যেখানে অনেক গাঢ়, আলোর আধিক্যও সেখানে অনেকটা বেশি। আমাদের জীবন-জীবিকায়ন তথা মানুষের মতো বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে কেউ যদি আবারও অন্ধকার টেনে আনার চেষ্টা করে, এই সাধারণ জনগণই আবার সেখানে আলো জ্বালিয়ে দেখিয়ে দেবে। তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ শেষবারের মতো কিন্তু গেলো বছর আমাদের নবীন-প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা দেখিয়ে দিয়েছে।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক, মানবাধিকার ও সংস্কৃতি কর্মী।