খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৯ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এমন একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের মাঝে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে—দেশে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও তাদের অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থ বরং কমছে। অর্থাৎ সংখ্যায় ধনী বাড়ছে, কিন্তু তাদের ব্যাংকে রাখা অর্থের পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এই দুই বিপরীতমুখী ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনীতির ভেতরে চাপ, অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের নতুন প্রবণতা এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে দেশে মোট কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল এক লাখ ২১ হাজার ৩৬২টি। জুন প্রান্তিকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টিতে—এক প্রান্তিকে বৃদ্ধি হয় প্রায় ছয় হাজার অ্যাকাউন্ট। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নতুন কোটিপতি অ্যাকাউন্ট যুক্ত হলেও সেই তিন মাসে এসব হিসাবের মোট জমা অর্থ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখ ২৮ হাজার ৭০টি—অর্থাৎ আরও ৭৩৪ জন নতুন কোটিপতি তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান দেখে অনেকেই ধারণা করতে পারেন যে দেশের ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকম। অর্থনীতিবিদদের মতে, পুরোনো বড়ো অঙ্কের মূলধনধারীরাই মূলত ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। ফলে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বাড়লেও মোট জমা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে নতুন কোটিপতিদের জমা তুলনামূলকভাবে ছোট, যা বড়ো ধনীদের উত্তোলিত অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না।
এদিকে, দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা তিন মাসে বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জুন শেষে মোট হিসাব ছিল ১৬ কোটি ৯০ লাখের বেশি, যা সেপ্টেম্বর শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০টিতে। তিন মাসে ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার নতুন অ্যাকাউন্ট চালু হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট আমানত ৩৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেলেও কোটিপতি হিসাবগুলোতে জমা কমে যাওয়াটা এক ধরনের অস্বস্তিকর সংকেত।
অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা আগের মতো নেই। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, টাকা শ্রেণিভেদে বিনিয়োগের প্রবণতা, ডলারসংকট, এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক ধনী ব্যক্তিকে বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। কেউ সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর করছেন, কেউ রিয়েল এস্টেট, স্বর্ণ বা ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ করছেন। ফলে ব্যাংকে জমা অর্থ কমছে।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, ঋণ খেলাপি ইস্যু, সুদের হার অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো কারণগুলোও বড়ো জমাকৃত অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সবমিলিয়ে, ব্যাংক খাতে নতুন কোটিপতি বাড়লেও তাদের অ্যাকাউন্টে জমা কমে যাওয়ার এই বৈপরীত্য অর্থনীতির ভেতরে চাপের একটি অশনিসংকেত। ভবিষ্যতে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাত আরও চাপে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।