খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে গত এক দশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদর হিসেবে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অর্থপাচারের প্রধান কৌশল হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে মূল্য কারসাজি বা ট্রেড মিসইনভয়েসিং। আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়, যা ধরা পড়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকিগুলোর একটি।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। এর একটি বড় অংশ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়েছে, যেখানে ব্যাংকিং ও আর্থিক গোপনীয়তার সুযোগ তুলনামূলক বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের অর্থপাচার দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করে, কারণ এর ফলে করযোগ্য আয় কমে যায় এবং সরকার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয়ে অর্থ সংকটে পড়ে। অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে অতীত সরকারের সময়কালে আরও বড় পরিসরে অর্থপাচারের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন নীতি-গবেষণায়। একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মোট প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা সে সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার সমান। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচারের সঙ্গে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ব্যাংকিং খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থপাচারের একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল | পাচারের পরিমাণ (ডলার) | গড় বার্ষিক হার | আনুমানিক টাকার পরিমাণ |
|---|---|---|---|
| ২০১৫–২০২৪ (১০ বছর) | ৬,৮৩০ কোটি | ৬৮৩ কোটি ডলার | প্রায় ৮.৩৩ লাখ কোটি টাকা |
| ২০০৯–২০২৩ (১৫ বছর) | ২৩,৪০০ কোটি | ১,৫৬০ কোটি ডলার (গড় আনুমানিক) | প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা |
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে বাণিজ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সেখানে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণও বেশি দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে চীনে এক দশকে প্রায় ৬.৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার, ভারতে প্রায় ১.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং থাইল্যান্ডে প্রায় ১.১৮ ট্রিলিয়ন ডলার অবৈধ অর্থপ্রবাহের অনুমান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্রেড মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এ সমস্যা আরও গভীর হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বাণিজ্যের আড়ালে এই বিপুল অর্থপাচার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।