অনিন্দ্য আকাশ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল ২০২৫
বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। বেশ ক বছর ধরেই। বাবাও শরীর নিয়ে খুব যত্নবান ছিলেন না। তিনি সব সময় ভাবতেন পরিবার আর সন্তানদের নিয়ে। সন্তানদের জন্য কী রেখে যাবেন। তাদের ভবিষ্যৎ সুখের জীবন ছিল তার একমাত্র ভাবনা। বাবা এক অর্থে লোভী ছিলেন। সম্পদ বাড়ানো ছাড়া আর কিছু ভাবতেন না। অথচ নিজের সুখের কথা ভাবতেন না। তার সন্তানরা বড় হচ্ছিল, তারা মানুষ হচ্ছিল কিনা সেটা তিনি ভাবতেন না। মাকেও সময় দিতেন না। তাই মা একা হয়ে গিয়েছিলেন। মা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।
বাবার কথা বলছিলাম। বাবাকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি করা গেল। তিনি যদিও গড়িমসি করছিলেন। হাসপাতালে তার ভালো লাগে না। হাসপাতাল ছিলে তার আতঙ্ক। এমন কি, কোনো আত্মীয় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও তিনি দেখতে যেতেন না। কেন যেন তার বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল হাসপাতালে গেলে তিনি আর ফিরে আসবেন না।
তবুও শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে আসতেই হলো। না এসে উপায় ছিল না। তার শরীরে জ্বর এল। জ্বরটা সারছিল না। তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন।
ডাক্তার অনেক পরীক্ষা করতে দিলেন। এতেও তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন। সামান্য জ্বর, আর তাতেই অত পরীক্ষা! শেষে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক দিয়েও জ্বর না সারায় আরও কিছু পরীক্ষা করাতেই হলো। পরীক্ষায় কিছু সমস্যা ধরা পড়ল। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আরও কিছু পরীক্ষা করাতে হবে। তার পর চিকিৎসা হবে। ভর্তি হলেন। পরীক্ষা চলতে থাকল। শরীর কিছুটা ভালোর দিকে যেতেই বাবা হাসপাতাল ছেড়ে দিলেন। আর একজন অবুঝকে তো জোর করে কোথাও রাখা যায় না। ছেলেরাও জোর করে নি। ওরা সম্পত্তির দেখভাল করে। হাসপাতালে ভর্তির আগে বাবাই সব দেখাশোনা করতেন। বাবা হাসপাতালে ভর্তি হলেছেলেরা জানতে পারে বাবার কত সম্পদ। আর বুঝতে পারে সম্পত্তি ঠিকঠাক রাখা, লোভীদের চোখ থেকে বাঁচিয়ে রাখা কত ঝামেলার। সম্পত্তি যেন এমন কিছু যা জোর করে দখল করে নিলেই কারো হয়ে যায়। এমন কি বাবা হাসপাতালে ভর্তির পর ভাইদের মধ্যে এমন ভাব চলে এসেছে কে কোনটা দখল করে নেবে। কেবল বড় ভাইটা দেখেছে বাবা কত পরিশ্রম করে সম্পত্তি অর্জন করেছেন।
সে ছোট ভাইদের বোঝাতে চেষ্টা করল, আগে বাবার চিকিৎসা, সেরে ওঠা। তার পর এসব নিয়ে ভাবলে হবে। সম্পত্তি তো কোথাও চলে যাচ্ছে না। চিকিৎসা ঠিকমতো না হলে বাবা চলে যেতে পারেন। ছোট ভাইগুলো মনে মনে ভাবে, অসুবিধা কী? সম্পত্তি তো আমাদেরই হবে। আর বাবা তো চিরকাল বেঁচে থাকবে না। আর বড় ভাইও ভাবে, ডাক্তার বাবার অবস্থা ভালো নয় বলেছেন। ভালো চিকিৎসা দরকার। দেশের বাইরের হাসপাতালে নিতে পারলে ভালো হয়। সে ভাবে, বাবা চিরকাল বেঁচে থাকবেন না। তবে তাকে ভালো চিকিৎসা দেয়া দরকার। কিন্তু ছোট ভাইগুলো বলে, দেশে কি ভালো চিকিৎসা নেই? বাবা তো নিজে চিকিৎসাই নিতে চান নি। তিনি বলতেন হায়াত যতদিন আছে বাঁচবেন। মৃত্যু এলে চলে যাবেন। আর এখন তো হাসপাতালে ভালো ডাক্তারের অধীন আছেন। ওদের কথা, বাবা যখন হাসপাতালে থাকতে চান না তখন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাসপাতালে কেন রাখতে হবে। বাড়িতে নিয়ে গেলে ভালো হয়। তাকে ভালো ভালো খাবার দেয়া যাবে। যত্ন করা যাবে। এখানে বাবাকে একা বিছানায় থাকতে হচ্ছে। আর বড় ছেলে বলে, হাসপাতাল রোগীর জন্য উত্তম জায়গা। এখানে ডাক্তার নিয়মিত দেখছেন, নার্স আছে সেবা করছেন৷ নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছেন।
ছোটরা বলে, তাতে তো লাভ হচ্ছে না। শুধু শুধু অনেক টাকা যাচ্ছে। বড় ছেলের কথা, চিকিৎসার খরচ শুধু শুধু হবে কেন? আর টাকা তো বাবারই। তোদের তো নয়। বাবা মারা টাকা কার হবে? অন্য কারো? বুঝতে চেষ্টা কর। কিন্তু বাবার অবস্থা ভালো নয়। এমন অবস্থায় কেউ বাড়িতে নিয়ে যায়? তার চিকিৎসার প্রয়োজন নেই! আছে, ডাক্তার ডেকে নিয়ে দেখাব। আর হায়াত মউত তো আল্লাহর ইচ্ছা। এই বিতর্কের মধ্যেই বাবার অবস্থা আরও খারাপের দিকে গেল। চিকিৎসার রীতি অনুযায়ী ডাক্তার তাকে আই সি ইউতে নিতে বললেন। বড় ছেলে কাছে ছিল, সব সময় থাকেও। ছোটরা মাঝে মাঝে আসে। বড় ছেলের সম্মতিতে আই সি ইউতে বাবাকে নেয়া হলো। ক্রমশ বাবার অবস্থার অবনতি হচ্ছে। ছোটরা সে কথা জানতে পেরেছে। বাবার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অর্গানগুলো অকেজো হয়ে যাচ্ছে বা কয়েকটি আর কাজ করছে না। তার দেহে কোনো ওষুধ তেমন কাজ করছে না। ফুসফুস আর হার্ট চালু রাখা আছে কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়ে। বড় ভাই আই সি ইউর বাইরে সিঁড়িতে বসে ছেলেদের জন্য বাবার অবদান আর কষ্টের কথা মনে করে কাঁদছে। তারা এবার খুশি। আই সি ইউ থেকে খুব কম রোগীই ফেরত আসে। বাবা বাঁচলেও কত দিন? বড়জোর সপ্তাহ। সপ্তাহ কি, এখন তো ঘণ্টার হিসাব। ছোট ভাইয়েরা বাবাকে আইসিইউতে আর বড় ভাইকে হাসপাতালে রেখেই নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে নিয়েছে। দাদার ভিটিতে বাবা বাড়ি বানিয়েছিলেন। ওটা ডেভেলপারকে দিয়ে দেবার জন্য ওরা সবাই একমত। শুধু বাবা রাজি ছিলেন না, আর বড় ভাই রাজি নয়। এখন সেটা দিয়ে দিতে পারবে। বড় ভাই একা বাধা দিয়ে পারবে না। বাবার অবস্থা আর দেশের অবস্থা এখন একই রকম।
লেখক: গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক
খবরওয়ালা/এমএজেড