খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে মাঘ ১৪৩২ | ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
একটি কণ্ঠস্বর, যা একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অবরুদ্ধ কোটি মানুষের কানে পৌঁছে দিত আশার বাণী। একটি নাম, যা বিশ্ববিবেকের কাছে উন্মোচন করেছিল একটি নির্যাতিত জাতির মুক্তির সংগ্রাম। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরম সুহৃদ, বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি আর নেই। গতকাল ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে দিল্লির একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল এবং বাংলাদেশ হারাল তার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এক সাক্ষী ও অকৃত্রিম অভিভাবককে।
১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল, তখন মার্ক টালি তাঁর কলম ও কণ্ঠের মাধ্যমে সেই নৃশংসতার খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে ‘বিবিসি’ মানেই ছিল মার্ক টালির ওপর অগাধ আস্থা। মানুষ রেডিওর নব ঘুরিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করত তাঁর সংবাদের জন্য। ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেছেন ঘরছাড়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা, যা বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছিল।
স্যার উইলিয়াম মার্ক টালির জীবন ও অবদানের সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ:
| তথ্যের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| পুরো নাম | স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি (Sir William Mark Tully)। |
| জন্ম ও মৃত্যু | ১৯৩৫ – ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬। |
| কর্মস্থল | ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)। |
| প্রধান পরিচিতি | বিবিসির নয়াদিল্লি ব্যুরো প্রধান (দীর্ঘ ২০ বছর)। |
| মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | একাত্তরের গণহত্যার সংবাদ বিশ্বজুড়ে প্রচার ও জনমত গঠন। |
| রাষ্ট্রীয় সম্মাননা | মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা (বাংলাদেশ সরকার)। |
| উপাধি | পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ (ভারত) এবং নাইট ব্যাচেলর (যুক্তরাজ্য)। |
বাংলাদেশের বিজয় অর্জন থেকে শুরু করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন—আমাদের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক প্রত্যক্ষদর্শী। কেবল একাত্তর নয়, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সামাজিক পরিবর্তনের সংবাদগুলোও তিনি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠতার সাথে তুলে ধরেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল রাজনীতি ও সমাজকে তিনি যতটুকু হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন, খুব কম বিদেশি সাংবাদিকই তা পেরেছেন।
বাংলাদেশের প্রতি তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সম্মানজনক ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। এছাড়া সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করে। ভারত সরকারও তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করেছিল। তাঁর প্রয়াণ কেবল সাংবাদিকতা জগতের ক্ষতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আপামর জনসাধারণের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি কেবল একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের বন্ধু। যখন একটি জাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ছিল, তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যের পথে অবিচল ছিলেন। বাংলাদেশের মানচিত্রে এবং বাঙালির হৃদয়ে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায়, স্যার মার্ক টালি। আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে আপনাকে স্মরণ করছি।