খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে পাচার হওয়া খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশ থেকে উদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যুক্ত করার বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংকের অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশ্বখ্যাত ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) বা গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হচ্ছে ‘নো উইন, নো ফি’ অর্থাৎ অর্থ উদ্ধার হলেই কেবল ফি দেওয়া হবে—এমন শর্তে। প্রথম ধাপে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম এবং বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের মতো প্রভাবশালী মহলের ছয়টি সুনির্দিষ্ট মামলায় এই আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বেলা তিনটায় শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উপস্থাপিত হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, এই আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযুক্ত ঋণখেলাপিদের বিদেশে থাকা গোপন সম্পদ ও অর্থ শনাক্ত করবে এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে আইনি সহায়তা দেবে। পরবর্তীতে এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো হবে।
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ (এনএফআইএস) বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এদিকে, জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭৮.২৩ বিলিয়ন ডলার)। এই ঋণের চরিত্রগত বিন্যাস নিচে দেওয়া হলো:
কনসেশনাল ঋণ (নমনীয় শর্তের ঋণ): মোট ঋণের ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
নন-কনসেশনাল ঋণ (কঠিন শর্তের ঋণ): মোট ঋণের ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি।
তবে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে সরকার। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।
অন্যদিকে, দেশের প্রান্তিক কৃষকদের স্বস্তি দিতে বড় ধরনের উদ্যোগের কথা জানান গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫Grid৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন কৃষক।
ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক তারল্যসংকট নিয়ে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থসংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকগুলো যাতে গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়মিত জরুরি তারল্যসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ জুন পর্যন্ত জরুরি তারল্যসহায়তা হিসেবে ব্যাংকগুলোকে মোট ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে তাদের বিস্তৃত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের পৃথক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বহুল আলোচিত একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন স্কিম-২০২৫’-এর আওতায় আনা হয়েছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক বন্ধ বা দেউলিয়া হলেও প্রত্যেক গ্রাহক নিশ্চিতভাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পাবেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ইতিমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে এবং প্রয়োজন হলে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করের পরিধি বাড়াতে মুদির দোকান ও বিউটি পারলারসহ বেশ কয়েকটি নতুন ব্যবসায়ী খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—তৈরি পোশাক ও কাপড়ের বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। মন্ত্রী জানান, এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল, যা নতুন এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।