খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে কার্তিক ১৪৩২ | ৬ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
এক ট্রিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ ১,০০০,০০০,০০০,০০০ মার্কিন ডলার। এই বিপুল অর্থের পরিমাণ ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, হংকং, কাতার ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় ১৭০টি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও বেশি। এমনকি হাঙ্গেরি, কাতার, পেরু, নাইজেরিয়া ও কুয়েতের মোট জিডিপি একত্র করলেও এই অঙ্কে পৌঁছায় না।
এই বিশাল পরিমাণ অর্থই টেসলা ইনকরপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্কের ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাব্য অঙ্ক। আগামী দশ বছরের বেশি সময় ধরে টেসলায় তার প্রায় ১৩ শতাংশ মালিকানার ভিত্তিতে তিনি যে বেতন ও প্রণোদনা পেতে পারেন, তা তাকে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
বৃহস্পতিবার টেক্সাসে টেসলার শেয়ারহোল্ডারদের ভোটাভুটির মাধ্যমে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মাস্ক ইতিহাসে নাম লিখাবেন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হিসেবে।
ট্রিলিয়ন ডলারের বিতর্ক
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও জলবায়ু সংকটের মধ্যে এমন বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজকে ‘‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অনৈতিক’’ বলে আখ্যা দিয়েছেন সমালোচকেরা। তাদের মতে, এই অর্থ মানবিক সংকট মোকাবিলায় ব্যয় করা হলে পৃথিবীর দারিদ্র্য অনেকাংশে লাঘব করা যেত।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়তে প্রতিবছর প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার—যা ১০ বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। অথচ মাস্কের প্রস্তাবিত আয়ের অর্ধেক অর্থই এই লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট হতো।
বর্তমানে মাস্কের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, যা তাকে বিশ্বের শীর্ষ ধনীর আসনে বসিয়েছে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর (মাস্ক ছাড়া) মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যান ধনী-গরিবের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অন্যদিকে টেসলা বলছে, এই প্যাকেজ মাস্কের নেতৃত্বে কোম্পানির গত ১০ বছরে ৮.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজারমূল্য তৈরি ও ৪০০ বিলিয়ন ডলার ইবিআইটিডিএ অর্জনের প্রতিফলন।
অক্সফামের ভবিষ্যদ্বাণী ও বৈষম্যের বাস্তবতা
২০২৪ সালে অক্সফাম এক প্রতিবেদনে জানায়, এক দশকের মধ্যে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার দেখা যাবে, এবং সম্ভবত একই সময়ে এমন পাঁচজন ট্রিলিয়নিয়ার তৈরি হতে পারেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ আরও দুই ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে—অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার করে তাদের আয় হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, দারিদ্র্য দূরীকরণের গতি গত দশকে মারাত্মকভাবে কমেছে। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ এ প্রক্রিয়াকে আরও শ্লথ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট সম্পদের ৪৫ শতাংশেরও বেশি দখলে রয়েছে মাত্র শীর্ষ এক শতাংশ মানুষের হাতে।
কর ও রাজনীতিক বিতর্ক
ধনীদের ওপর কর আরোপের দাবিতে মার্কিন রাজনীতিক বার্নি স্যান্ডার্স দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ থাকলে সরকার অতিরিক্ত অংশ বাজেয়াপ্ত করবে। তিনি বলেন, “৯৯৯ মিলিয়ন ডলার দিয়েই মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারে।”
২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী থাকাকালে স্যান্ডার্স বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ০.১ শতাংশ ধনীর (যাদের সম্পদ ৩২ মিলিয়ন ডলারের বেশি) ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করলে ১৫ বছরে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমানে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনাসহ কয়েকটি দেশে সম্পদের ওপর কর কার্যকর রয়েছে।
মাস্কের লক্ষ্য—‘নিয়ন্ত্রণ’
ইলন মাস্কের মতে, টেসলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার ‘অপটিমাস’ নামের মানবাকৃতি রোবট প্রকল্পের ওপর। তিনি মনে করেন, এটি টেসলার মূল্যায়নের প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করবে। তার ভাষায়, “আমি টাকা খরচ করতে চাই না, তবে যদি আমরা রোবট বাহিনী তৈরি করি, তবে তার ওপর আমার শক্ত প্রভাব থাকা দরকার।”
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মাস্ক কেবল সম্পদ নয়, টেসলার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান। তিনি সতর্ক করেছেন, মালিকানা না বাড়ালে তিনি কোম্পানির নেতৃত্ব ছাড়তেও পারেন।
টেসলার অবস্থান
টেসলা বোর্ড জানিয়েছে, এটি একটি কর্মদক্ষতানির্ভর দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা প্যাকেজ। বোর্ডের চেয়ারম্যান রবিন ডেনহল্ম বলেন, “ইলন ছাড়া টেসলা তার মূল্য হারাতে পারে। কারণ আমাদের লক্ষ্য জ্বালানি ও শ্রমের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠন করা।”
তবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে টেসলার বড় শেয়ারহোল্ডার নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল, এবং প্রক্সি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গ্লাস লুইস ও ইনস্টিটিউশনাল শেয়ারহোল্ডার সার্ভিসও ভোটারদের ‘না’ বলার আহ্বান জানিয়েছে।
টেসলা বলছে, মাস্ক একবারে সব নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছেন না—১২টি কর্মক্ষমতা সূচক পূরণের প্রতিটি ধাপের পর তার ভোটাধিকার বাড়বে। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের পর্যবেক্ষণ ও ভারসাম্য বজায় থাকবে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে টেক্সাসের ভোটাভুটির দিকে—ইলন মাস্ক কি সত্যিই ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হতে যাচ্ছেন?