খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 11শে মাঘ ১৪৩২ | ২৪ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের সূচনা করে জাতিসংঘভুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে সংস্থাটির বৃহত্তম দাতা দেশ হিসেবে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবসান ঘটাল ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি তাঁর অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মূলত কোভিড-১৯ মহামারীর সময় থেকেই সংস্থাটির বিরুদ্ধে ‘চীন-ঘেঁষা’ হওয়ার অভিযোগ তুলে আসছিল ট্রাম্প প্রশাসন, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বিচ্ছেদে রূপ নিল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংস্কারে অক্ষমতা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অহেতুক রাজনৈতিক প্রভাব এবং মহামারীর ভুল ব্যবস্থাপনার কারণেই তারা এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ডব্লিউএইচও তার মূল লক্ষ্য ত্যাগ করে বারবার মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এতদিন যে বিপুল অর্থ ও সহায়তা দিয়েছে, সংস্থাটি তার মর্যাদা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করছে।
এক নজরে মার্কিন প্রত্যাহার ও এর প্রভাব:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| মূল দাতা দেশ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ডব্লিউএইচও-এর মোট বাজেটের বড় অংশ)। |
| বকেয়া অর্থের পরিমাণ | প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ডলার (ডব্লিউএইচও-এর দাবি অনুযায়ী)। |
| প্রধান অভিযোগ | সংস্থাটির চীন-নির্ভরতা ও সংস্কারে অনীহা। |
| প্রত্যাহারকৃত জনবল | জেনেভাসহ বিশ্বব্যাপী ডব্লিউএইচও অফিস থেকে মার্কিন কর্মী ও ঠিকাদার। |
| বিকল্প ব্যবস্থা | বিভিন্ন এনজিও ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা। |
| আক্রান্ত খাত | পোলিও নির্মূল, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ ও মাতৃমৃত্যু রোধ কর্মসূচি। |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক বিদায়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস। তিনি একে বিশ্বজনীন জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘ক্ষতিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল অর্থায়ন বন্ধ করেনি, বরং ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের সদস্য ফি-ও পরিশোধ করেনি। এর ফলে ইতিমধ্যে সংস্থাটিতে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই ও বাজেট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ডব্লিউএইচও-এর আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ২৬০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পরিশোধ করতে বাধ্য, যদিও ওয়াশিংটন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ডব্লিউএইচও মূলত পোলিও, এইচআইভি এইডস, মাতৃমৃত্যু রোধ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে কাজ করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এই কর্মসূচিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন জানিয়েছে তারা বিভিন্ন এনজিও এবং বিশ্বাস-ভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে এসব কাজ চালিয়ে যাবে, তবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিনের তথ্য আদান-প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
কোভিড-১৯ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শাসিত রাজ্যগুলোর মধ্যে মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে যে মতভেদ ছিল, তা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউন আরোপে দ্বিধা এবং ডব্লিউএইচও-এর বৈজ্ঞানিক পরামর্শ উপেক্ষা করার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর হার ছিল বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহামারী চুক্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন ও ওষুধের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান কেবল একটি দেশের বিদায় নয়, বরং বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি। জেনেভায় আগামী ২ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির বোর্ড সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা রয়েছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—তারা কি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিশ্বের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারবে, নাকি এই বিচ্ছেদ নতুন কোনো বৈশ্বিক মহামারীর পথ প্রশস্ত করবে?