খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ৬ই জুন ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ বুরকিনা ফাসোর সেনাশাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু তার দেশেই নয়, পুরো আফ্রিকাজুড়ে নিজেকে এক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ৩৭ বছর বয়সী এই ক্যারিশমাটিক নেতা অনেকের কাছেই এখন ‘আফ্রিকার চে গেভারা’। তার রাজনৈতিক অবস্থান, সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব উপস্থিতি ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান তাকে আফ্রিকার তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলেছে।
২০২২ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাওরে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় স্বর্ণ খনি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বামপন্থী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত তাকে শুধুমাত্র বুরকিনা ফাসোতেই নয়, আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও জনপ্রিয় করে তোলে।
রাশিয়া-আফ্রিকা সামিটে ২০২৩ সালে ট্রাওরের ভাষণ আন্তর্জাতিক মহলে দারুণ সাড়া ফেলে। সেখানে তিনি আফ্রিকান নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রতিবার সাম্রাজ্যবাদী নেতাদের ঘোরানো ছড়ির ইশারায় পুতুলের মতো নাচা বন্ধ করুন।’ তার এই বক্তব্য রুশ গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং তাকে আফ্রিকার প্রতীকী নেতা হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণা জোরদার হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বিশ্লেষকরা বলছেন, বুরকিনা ফাসোর গড় বয়স মাত্র ১৭.৭ বছর। তরুণ ট্রাওরে এই তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন বলেই তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। দক্ষ বক্তা হিসেবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দারুণ সক্রিয়, যা তাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে – বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান ও কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যেও।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে বুরকিনা ফাসোর অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশটির চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা খাতে বাজেট বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) জানায়, দেশটি ঘরোয়া রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তবে ট্রাওরের শাসনব্যবস্থায় সমালোচনারও অভাব নেই। ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সফলতা অর্জন করতে না পারা, বিরোধীদের দমন, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং সমালোচকদের যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে তার সরকারের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সঙ্গে তার সম্পর্কও বেশ শীতল। মার্কিন সেনা কমান্ডার জেনারেল মাইকেল ল্যাংলি ট্রাওরের বিরুদ্ধে দেশের সম্পদ নিজের শাসন মজবুত করতে ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন, যা বুরকিনা ফাসোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
বুরকিনা ফাসোর রাজধানীতে সম্প্রতি আয়োজিত এক বিশাল সমর্থন র্যালি ট্রাওরের জনপ্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ। তিনি সেই র্যালির পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তার সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান এবং নতুন আফ্রিকার স্বপ্নে সবাইকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানান।
ইব্রাহিম ট্রাওরে নিছক একজন সেনাশাসক নন, তিনি আফ্রিকার রাজনীতিতে পরিবর্তনের বার্তাবাহক। গবেষকদের মতে, তিনি যদি গণতন্ত্র, সুশাসন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে এগিয়ে যান, তবে তিনি হয়তো আফ্রিকার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।