খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল, অনন্য নাম— ভগিনী নিবেদিতা। তিনি রক্তে ছিলেন স্কটিশ, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন ভারতবর্ষকে— তার মানুষ, সংস্কৃতি, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে।
আধুনিক ভারতের শ্রেষ্ঠ মনীষী ও ধর্মনেতা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল ভারতবর্ষে আগমন করেন। ১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই নারীর জীবনের পথচলা একসময় সম্পূর্ণ নতুন মোড় নেয়— যখন তিনি বিবেকানন্দের চিন্তা, দর্শন ও দেশপ্রেমের স্পর্শ পান।
ইংল্যান্ডে এক আলোচনাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের বাণী শুনে তার হৃদয়ে জেগে ওঠে এক নতুন আলোকধারা। স্বদেশ, সমাজ, নারী ও শিক্ষার মুক্তির যে বার্তা তিনি সেখানে পান, তা-ই হয়ে ওঠে তার জীবনের ব্রত।
১৮৯৮ সালে তিনি ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা হয়ে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন। তখনই গুরু তার নতুন নাম দেন— “নিবেদিতা”, অর্থাৎ ‘সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত’।
কলকাতায় এসে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেন সমাজসেবায়। ১৮৯৮-৯৯ সালের প্লেগ মহামারীতে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অসুস্থ ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি। অদম্য সাহস, মমতাময় হৃদয় ও মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
নারী শিক্ষার প্রসারে স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বাগবাজারে প্রতিষ্ঠা করেন একটি বালিকা বিদ্যালয়। শুধু কন্যাশিক্ষাই নয়, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের শিক্ষার প্রতিও তিনি সমানভাবে মনোযোগী ছিলেন।
দেশপ্রেমের অনল জ্বেলে দিতে ভগিনী নিবেদিতা সক্রিয়ভাবে যোগ দেন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে। দেশবাসীকে বিলেতি পণ্য বর্জনে উদ্বুদ্ধ করেন, জাগিয়ে তোলেন আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বদেশচেতনা।
তার চোখে ছিল এক অখণ্ড, স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন— যেখানে নারী-পুরুষ সকলেই শিক্ষিত, স্বনির্ভর ও মুক্তচিন্তার অধিকারী হবে। প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও রচনার মাধ্যমে তিনি ভারতবাসীকে অনুপ্রাণিত করেছেন জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও মানবতার বোধে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, শ্রী অরবিন্দ, ব্যারিস্টার প্রমথ মিত্র প্রমুখ মনীষীর সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাদের চিন্তায় ও কর্মকাণ্ডে তিনি নতুন আলোর সংযোজন ঘটান।
তার রচিত গ্রন্থসমূহ—
“The Web of Indian Life,” “Kali the Mother,” “The Master As I Saw Him,” “Hints on National Education in India,” “Aggressive Hinduism” — ভারতীয় সমাজ, শিক্ষা ও ধর্মদর্শনের ওপর অমূল্য সংযোজন হয়ে আছে।
১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর, মাত্র ৪৩ বছর বয়সে, এই অসামান্য নারীর জীবনাবসান ঘটে।
কিন্তু তার নাম আজও ইতিহাসের পাতায় অমর
এক ভিনদেশী নারী, যিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতের নিজস্ব কন্যা— ভগিনী নিবেদিতা।