খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতিসত্তা, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে জীবন বিসর্জন দেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অগণিত ভাষাসৈনিক। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। প্রতিটি মিনারই কেবল স্থাপত্য নয়; ইতিহাস, প্রতিবাদ ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
ঢাকার হৃদয়ে অবস্থিত এই মিনার ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা প্রথম অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। বদরুল আলমের নকশায় ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে রাতারাতি গড়ে ওঠা প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার সেই মিনার ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশ ও সেনাবাহিনী ভেঙে দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে বর্তমান স্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৫৭ সালে ভাস্কর হামিদুর রহমানের নকশায় নির্মাণকাজ শুরু হলেও ১৯৫৮ সালের সামরিক আইন জারির ফলে তা বন্ধ হয়ে যায়। সংশোধিত নকশায় ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম মিনারটি উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ধ্বংস করা হলেও স্বাধীনতার পর পুনর্নির্মাণ করা হয়।
পাঁচটি স্তম্ভকে কেউ মা ও সন্তানের প্রতীক, আবার কেউ প্রসারিত হাতের পাঁচ আঙুলের প্রতিরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ন্যস্ত।
ঢাকার অদূরে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি দেশের অন্যতম উচ্চতম। শিল্পী রবিউল হোসাইনের নকশায় নির্মিত মিনারের ভিত্তিমঞ্চের ব্যাস ৫২ ফুট—১৯৫২ সালের স্মারক হিসেবে। স্তম্ভের উচ্চতা ৭১ ফুট—১৯৭১ সালের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০০৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। তিনটি স্তম্ভ যথাক্রমে ভাষা-সংস্কৃতি, প্রতিবাদ-সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য। কাইজার আহমেদ ও রাজীব জহিরের নকশায় নির্মিত মিনারে পাঁচটি বাঁকানো স্তম্ভ ভেতরের দিকে ঝুঁকে রয়েছে, যা ঐক্য ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। মাঝের শূন্যস্থান ত্যাগের গভীরতা নির্দেশ করে, আর পেছনের রক্তিম সূর্য নতুন ভোরের প্রতীক হিসেবে উদ্ভাসিত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অস্থায়ী মিনার নির্মিত হয়। ২০১৮ সালে সংস্কারকৃত কেন্দ্রীয় মিনারটির উচ্চতা ৫২ ফুট। ত্রিভুজাকৃতি নকশায় তিন পাশে তিন রঙের আবরণ দেশের তিন প্রধান নদী—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার প্রতীক। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
১৯৭২ সালে শিল্পী মুর্তজা বশীরের পরিকল্পনায় নির্মিত এ মিনারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র। পাঁচ ফুট উঁচু বেদির ওপর তিনটি স্তম্ভ ভাষা শহীদদের ঐক্যবদ্ধ আত্মত্যাগের প্রতিফলন ঘটায়। একুশের প্রভাতফেরি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিবাদ সমাবেশে এটি প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
| বিশ্ববিদ্যালয়/স্থান | নির্মাণ/উদ্বোধন | উচ্চতা/মাত্রা | বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার | ১৯৬৩ (পুনর্নির্মাণ ১৯৭১ পরবর্তী) | বহুমাত্রিক স্তম্ভ | পাঁচ স্তম্ভ, ভাষা আন্দোলনের মূল প্রতীক |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় | ২০০৮ | ৭১ ফুট | ৫২ ফুট ভিত্তি, তিন প্রতীকী স্তম্ভ |
| জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় | ২০০৫ পরবর্তী | পাঁচ বাঁকানো স্তম্ভ | বিমূর্ত স্থাপত্য, রক্তিম সূর্য |
| বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় | ২০১৮ (সংস্কার) | ৫২ ফুট | ত্রিভুজাকৃতি, তিন নদীর প্রতীক |
| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | ১৯৭২ | তিন স্তম্ভ | সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র |
শহীদ মিনারগুলো কেবল স্থাপত্যকর্ম নয়; এগুলো জাতির আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান দলিল। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে লাখো মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই স্মৃতিস্তম্ভগুলোর তাৎপর্য বৈশ্বিক মাত্রা পায়।
ভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। শহীদ মিনার তাই অতীতের স্মারকই নয়; ভবিষ্যতের প্রেরণাও।