ভাষা আন্দোলনে নারী 

১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে বাঙালি জাতিসত্ত্বার চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠন হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গোটা দেশের মানুষকে পাকিস্তানি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। আর এজন্য প্রয়োজন হয় পাকিস্তানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা মুছে ফেলার। জনসংখ্যার দিক থেকে বাঙালিরা ছিলো পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। ভৌগোলিক দিক থেকেও পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব বাংলা ছিলো অস্বাভাবিক অবস্থান। তাই প্রথম আঘাত আসে বাঙালিদের ওপর। এই জাতিসত্তা মু হা দিতেই আঘাত করে বাঙালির ভাষার ওপর। নতুন রাষ্ট্রের জন্য সরকারের বিস্তর গুরুত্বপুর্ণ কাজ ফেলে পাকিস্তানের নেতারা রাষ্ট্র ভাষার বিতর্কের জন্ম দেয়।
ধর্ম কখনও জাতিগত পরিচয় হতে পারে না, পাকিস্তানের নেতারা এই সহজ বিজ্ঞানটাও উপেক্ষা করে। ফল হিসেবে বাঙালির মনন মানসে লালিত জাতিসত্ত্বার বিষয়টি জাগ্রত হয়। এ সময়ে জ্ঞান তাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’ এ কারণে রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে জাতিগতভাবেই বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়, গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন। রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা শহীদরা বুকের রক্ত দিয়ে রক্ষা করে মাতৃভাষার মর্যাদা। ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সর্বস্তরের মানুষ। এই আন্দোলনে পিছিয়ে ছিলেন না এ দেশের নারী সমাজও।
দেশ ভাগের পর গণপরিষদে বিতর্ক সৃষ্টির সাথে সাথেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় বক্তৃতাকালে বাঙালিকে আরো খেপিয়ে তোলেন। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan”। সাথে সাথেই ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। একই দিনে তিনি রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতায় একই কথা বলেন। তার বক্তব্য ভাষা আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে।

WhatsApp Image 2026 02 20 at 1.43.39 PM ভাষা আন্দোলনে নারী 
আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রসমাজের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং শিক্ষিকাগণও। বক্তৃতা বিবৃতি ছাড়াও হাতে লেখা পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড ছিলো গুরুত্বপুর্ণ প্রচার উপকরণ। এই পোস্টার লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানা যায়। এই কাজটি তখন খুব সহজে করা সম্ভব ছিল না। সরকারি নির্যাতনের পাশাপাশি ভয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তির। হল থেকে বহিষ্কারের চেয়ে বড় শাস্তি ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার হওয়ার ভয়। তাই সংগোপনে এই কাজগুলো করতে হতো।
১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ছিলো ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপুর্ণ কর্মসূচি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে “ভাষা দিবস” নামে এদিন সাধারণ ধর্মঘট ঢাকা হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এটাই ছিল প্রথম সাধারণ ধর্মঘট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ধর্মঘট সফল করতে ছাত্রদের সাথে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। রাজপথে নেমে আসে ছাত্রীরাও। ইডেন কলেজের ছাত্রীরাও মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। রাস্তায় পিকেটিংয়ের নামে ছাত্রীরাও। ছাত্রদের ওপর পুলিশ লাঠি চার্জ করলে তাদের রক্ষা করতে ছাত্রীরা এগিয়ে আসে। পুলিশের নির্যাতনে অনেকেই হয়ত হন। এদিন মিছিল থেকে পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু), অলি আহাদ, শামসুল হকসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন। এর প্রতিবাদে গণপরিষদেও তীব্র বিতর্ক হয়। মুসলিমলিগ আন্দোলনের বিরোধ হলেই গণপরিষদের মুসলিমলিগের অনেক সদস্য পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের মধ্যে মুসলিম লীগ নেত্রী আনোয়ারা খাতুন অন্যতম।
রাস্তায় মিছিল ছাড়াও হল বা ছাত্রাবাসে অবস্থান করেও আন্দোলনকে গতিশীল করতে নানাভাবে ভূমিকা পালন করত। ছাত্রদের গ্রেফতার বা কারাবন্দি করায় মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা এক অভিনব কর্মসূচি পালন করে।স্কুলের ছাঁদে উঠে তারা সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একনাগাড়ে স্লোগান দিতে থাকে। স্লোগানের ভাষা ছিলো- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’ ইত্যাদি। অনেকদিন তারা এমন কর্মসূচি পালন করে।

WhatsApp Image 2026 02 20 at 1.43.45 PM ভাষা আন্দোলনে নারী 
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ২১শে ফেব্রুয়ারি অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। এই দিবসটি আর শুধু বাঙালির নয়, বিশ্ববাসীর হয়েগেছে। দিবসটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সরকার আন্দোলন দমনে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় তখন বিশাল ছাত্র জমায়েত। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নামার সিদ্ধান্তে অটল। সাফিয়া খাতুন, সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন্নাহার আহসানের নেতৃত্বে ছাত্রীরাও সংগঠিতভাবে যোগ দেয়। সমাবেশ থেকে সিদ্ধান্ত হয় ১০জনের দলে বিভক্ত হয়ে একে একে রাস্তায় নামা হবে।
প্রথম দলটি গঠন করতে ছাত্রীরা এগিয়ে আসে। এই দলে নেতৃত্ব দেন সাফিয়া খাতুন। দলে ছিলেন সারা তৈফুর, সোফিয়া করিম, সুফিয়া আহমেদ, হালিমা খাতুন, চমেন আরা, মনোয়ারা ইসলাম, আমেনা আহমেদ, জুলেখা নুরী, সুরাইয়া সহ আরো অনেকে। সেদিন ছাত্রদের দল বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ তাদের আটক করে ট্রাকে তুলে নেয়।  পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙাতে এগিয়ে আসে ছাত্রীরা। পুলিশ নির্মমভাবে ছাত্রীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল ছুড়ে। রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া ইব্রাহিম, সারা  তৈফুরসহ অনেক ছাত্রী আহত হয়।
অনেক ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আন্দোলনের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, ভাষা আন্দোলনে রচিত হয় এক রক্তাক্ত অধ্যায়। রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার, সালামসহ অসংখ্য শহীদের রক্তে লেখা হয় মাতৃভাষার মর্যাদা। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড ভাষার সংগ্রামকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং আন্দোলনকে আরো বেগবান করে।
পরদিন  থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে  বিক্ষোভ
প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। ঢাকার অভয় দাস লেনে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ
[1:42 PM, 2/20/2026] Titon Bhai: সমাবেশ হয়। সমাবেশে বেগম সুফিয়া কামাল, নূরজাহান মুরশদি, দৌলতুন্নসো খাতুন প্রমুখের নেতৃত্বে অসংখ্য নারী অংশ, নেন।
আন্দোলন আর ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। নারায়ণগঞ্জরে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করে কোর্টে আনা হয়। সর্বস্তরের জনগণ কোর্ট প্রাঙ্গণে সমবেত হয় এবং বিনাশর্তে তার মুক্তি দাবি করে। কারবন্দি অবস্থায় বন্ড দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি লাভে অস্বীকৃতি জানান মমতাজ বেগম। এই শর্তসাপেক্ষে মুক্তি না নেওয়ার কারণে তার স্বামী তালাক দেন। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেনু ধর এবং শাবানীকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
সিলেটের সালেহা বেগম ভাষাশহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করেন, এ অপরাধের কারণে তাকে স্কুল থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।  সিলেটের ছাত্রীরা আন্দোলনে জোরাল ভূমিকা রাখেন।  কুমিল্লার অধ্যাপিকা লায়লা নূর। ১৯৪৮ থেকে বায়ান্নর সব আন্দোলনেই ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনি কারাগারে নির্যাতনের শিকার হন ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করার কারণে।  নড়াইলে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন সুফিয়া খাতুন, রিজিয়া খাতুন ও রুবি। ১৯৫৩ সালে দেড় বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান মমতাজ।
এদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রানেই এদেশের নারী সমাজ অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণে হয়েছে অর্থপূর্ণ।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম কর্মী
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।