খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) কলকাতার রেড রোডে দেশনায়ক সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের এই মানসিক চাপে রাজ্যে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ জন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই প্রক্রিয়ার কারণে রাজ্যে এ পর্যন্ত ১১০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার দায়ভার কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত এই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজ্যের বিশাল সংখ্যক ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ১.৬৬ কোটি ভোটারের নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এই যাচাইকরণের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে নাম বা পদবির বানানে সামান্য ভিন্নতা থাকলেই নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, প্রায় ১.৩৮ কোটি মানুষকে এ পর্যন্ত নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) বর্তমান চিত্র:
| তথ্যের বিবরণ | পরিসংখ্যান/বিস্তারিত |
| মোট ভোটার সংখ্যা (রাজ্যে) | ৭.৬ কোটি। |
| নথি যাচাইয়ের নোটিশ প্রাপ্ত ভোটার | ১.৬৬ কোটি। |
| খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটার | ৫৮ লক্ষ। |
| অনুসন্ধানের আওতায় থাকা মোট জনসংখ্যা | ১.৩৮ কোটি। |
| দাবীকৃত মৃত্যুর সংখ্যা | ১১০ জনের বেশি। |
| প্রতিদিন গড় আত্মহত্যার হার | ৩-৪ জন। |
| হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (উদ্বেগের কারণে) | ৪০-৪৫ জন। |
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি সংস্কৃতির উদাহরণ টেনে বলেন যে, বাংলায় একই পদবি বিভিন্নভাবে লেখার প্রচলন রয়েছে। তিনি নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আমার পদবি কেউ ‘ব্যানার্জি’ লেখেন, কেউ ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’। এটি একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু এসআইআর পরিচালনাকারীরা এই সামান্য বিষয়টি বুঝছেন না এবং তুচ্ছ কারণে মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।” এমনকি তিনি বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন যে, কেন তাঁর মতো ব্যক্তিত্বকেও নোটিশ পাঠিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নেতাজি বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁকেও আজ নাগরিকত্বের শুনানির জন্য তলব করা হতো।
বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করে মমতা বলেন যে, বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। তিনি একে বাংলার বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিআর আম্বেদকর এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের আদর্শকে অবমাননা করা হচ্ছে। তিনি বিজেপিকে ‘কৌরব’ এবং নিজের পক্ষকে সত্যের লড়াকু সৈনিক হিসেবে তুলনা করে বলেন, “আমরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। গেরুয়া ব্রিগেড দেশের ইতিহাস বদলে দিয়ে নিজেদের সংস্করণ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।”
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছে, তা মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণের এই লড়াইয়ে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি তিনি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রকে চূর্ণ করার এই প্রচেষ্টা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের ফলে আগামীতে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মোড় কোন দিকে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।