খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধাবস্থার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে সামরিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশেও এর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার লক্ষ্য করা গেছে। অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চালকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মগবাজার, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও এবং মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের অধিকাংশ পাম্পে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। মগবাজারের মহিন মোটরস ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার চালকদের। কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, গত কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা আসবামাত্রই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পের চিত্র নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ফিলিং স্টেশনের নাম | অবস্থান | বর্তমান অবস্থা | কর্মচারীদের বক্তব্য |
| মহিন মোটরস | মগবাজার | বন্ধ | গত দুই দিন ধরে ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ। |
| পূর্বাচল ট্রেডার্স | পরীবাগ | সাময়িক বন্ধ | পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে তেল পাওয়া যায়নি। |
| কারিম অ্যান্ড সন্স | মতিঝিল | বন্ধ | ৩০ হাজার লিটারের জায়গায় মাত্র ১৩ হাজার লিটার বরাদ্দ। |
| বিনিময় ফিলিং স্টেশন | দৈনিক বাংলা | আংশিক খোলা | শুধু ডিজেল আছে, অকটেন নেই। |
| মেঘনা মডেল সার্ভিসিং | পরীবাগ | খোলা | দীর্ঘ লাইন, চাহিদার তুলনায় মজুদ সীমিত। |
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও।
সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো গ্রাহকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক। তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কের কেনাকাটা শুরু করেছেন। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই অতিরিক্ত তেল মজুদ করার চেষ্টা করায় সরকারের বিদ্যমান মজুদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সূত্রে জানা গেছে, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ডিপোগুলো থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় ডিলাররা পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। মতিঝিলের পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০ হাজার লিটার তেল পাওয়া যেত, এখন সেখানে অর্ধেকেরও কম সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে সরকারকে রেশনিং ব্যবস্থার কথা ভাবতে হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণকে ধৈর্য ধরার এবং অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল মজুদ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজধানীর যে দু-একটি পাম্পে তেল বিক্রি হচ্ছে, সেখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তাও প্রয়োজন হতে পারে।