খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বুধবার যুদ্ধের পঞ্চম দিনে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে এবং লেবাননে হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পেন্টাগন এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি অনুযায়ী, এই অভিযান মূলত ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত। তবে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই; পাল্টা জবাব হিসেবে তারা মার্কিন মিত্রদেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বৃষ্টির সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে এখন যুদ্ধের দামামা বাজছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক এক বিশাল সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। এতে ৫০ হাজারের বেশি সেনা, দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং অত্যাধুনিক বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তারা ইরানের প্রায় ১ হাজার স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, ইরানের রাজধানী তেহরান এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে শহরটি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইরানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশু ও বেসামরিক নাগরিক রয়েছে।
নিচে যুদ্ধের পঞ্চম দিন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| যুদ্ধের ক্ষেত্র | প্রধান ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি |
| ইরান (অভ্যন্তরীণ) | তেহরানসহ ১৫০টি শহরে হামলা; নিহতের সংখ্যা ১০৪৫ জন (সরকারি মতে)। |
| কাতার (আল-উদেইদ) | মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটে ইরানি ড্রোনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড। |
| লেবানন সীমান্ত | ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সীমান্ত থেকে ৬ কিমি ভেতরে খিয়াম শহরে প্রবেশ করেছে। |
| ভারত মহাসাগর | শ্রীলঙ্কা উপকূলে মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস; নিহত ৮৭। |
| অর্থনৈতিক প্রভাব | হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আইআরজিসি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা। |
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে কাতারস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি আল-উদেইদ-এ সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এছাড়া দুবাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেটে ড্রোন হামলা চালিয়ে তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, কোনো মার্কিন স্থাপনাই এখন নিরাপদ নয়। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ইরান বর্তমানে তাদের অপেক্ষাকৃত সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে এই স্বল্পমূল্যের অস্ত্রগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (যেমন- আয়রন ডোম বা প্যাট্রিয়ট) ওপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটররা অভিযোগ করছেন, কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন একটি অনির্ণীত যুদ্ধের দিকে দেশটিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক ক্রিস্টোফার প্রেবল সতর্ক করে বলেছেন, ইরান আয়তনে ইরাকের চেয়ে কয়েক গুণ বড়। ফলে এখানে স্থল অভিযান চালাতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে এক ভয়াবহ চোরাবালিতে আটকা পড়তে হতে পারে।
রাশিয়া এবং চীন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। কানাডার পক্ষ থেকেও এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের আকাশসীমা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই অভিযান থামবে না।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর রাজপথ রক্তে রঞ্জিত। একদিকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের লড়াই, অন্যদিকে আঞ্চলিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এই সংঘাত যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।