খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
ইসলাম সব ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে সুসমঞ্জস্য ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা প্রদান করে। এর ইবাদত, সমাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ-শান্তি—কোনো ক্ষেত্রেই ভারসাম্যহীনতার জায়গা নেই। সর্বত্রই ইসলাম মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যমপন্থা শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
শরিয়তের নীতিতে এই মধ্যমপন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিকেই ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বলা হয়। এটি সহজ, সরল এবং সঠিক পথ; পূর্ব বা পশ্চিম প্রান্তের নয়, উত্তর বা দক্ষিণ প্রান্তের নয়, আঁকাবাঁকা নয়। এটি আল্লাহর ক্রোধগ্রস্ত বা পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের পথও নয়।
আল্লাহ কোরআন মাজিদে এই উম্মতকে ‘উম্মাতান ওয়াসাতান’ বা মধ্যপন্থী উম্মত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে এক মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত ১৪৩)
ইসলাম কোনো ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়িকে প্রশ্রয় দেয় না। ঈমান-আকিদা থেকে সমাজ, পরিবার, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি—সর্বত্রই এই ভারসাম্য বিধৃত। সাধারণত মানুষ বিশ্বাস ও ইবাদতে আবেগের শিকার হয়ে যায়। ইসলাম ইহুদি ও নাসারাদের অতিরিক্ত আচরণের উদাহরণ উল্লেখ করে মুসলিমদের সতর্ক করেছে। পূর্বে এমন অতিরিক্ত আচরণের কারণে অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছে। নবী-রাসুলদের কবরকেও তারা সিজদার স্থান বানিয়েছিল।
হাদিসে আছে, দুনিয়া থেকে শেষ বিদায় নেওয়ার সময় নবীজি (সা.) উম্মতকে সতর্ক করেছেন কবরপূজা না করার জন্য। তিনি বলেন, ‘সাবধান! তোমাদের আগে যারা ছিল তারা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরকে সিজদার জায়গা হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সাবধান! তোমরা কবরকে সিজদার জায়গা বানিও না।’ (ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস ৫৩২)
ইবাদত-বন্দেগিতেও ইসলাম বাড়াবাড়ি পছন্দ করেনি। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দ্বিন খুব সহজ। যে-ই দ্বিনকে কঠোর করবে সে পরাজিত হবে।’ (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস ৩৯) কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের দ্বিনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না।’ (সুরা আল মায়িদা, আয়াত ৭৭)
উমর (রা.) বলেছেন, ‘বাড়াবাড়ি করা থেকে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।’ (ইবন হাজার, ফতহুল বারি ১৩/২৮৫)
নবী (সা.) মসজিদে এক দড়ি টানানো দেখলে জিজ্ঞেস করেন, কেন? বলা হয়, জয়নব (রা.) এখানে নামাজে বিশ্রাম নেন। নবীজি (সা.) বলেন, এটি খুলে ফেলো। নফল নামাজ করবে যতক্ষণ শরীরে শক্তি থাকবে; ক্লান্ত হলে ঘুমিয়ে পড়বে। (ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস ৭৮৪; ইমাম আহমদ, আল মুসনাদ, হাদিস ১২৭০৮)
আনাস (রা.) বলেন, সাহাবিরা নবী (সা.)-এর ইবাদতের ধরন জানতে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলে জানেন, তিনি ইবাদতও করেন এবং নিদ্রাও নেন। কখনও রোজা রাখেন, কখনও না। প্রয়োজনে স্ত্রীগমনও করেন।
সাহাবিদের মধ্যে কিছু মনে করলেন, নবী (সা.) নিষ্পাপ হলেও আমরা পাপগ্রস্ত; আমাদের বেশি ইবাদত করতে হবে। একজন বলেন, আমি কখনো রোজা ছাড়ব না; একজন বলেন, পুরো রাত জেগে ইবাদত করব; একজন বলেন, স্ত্রী গ্রহণ করব না।
নবী (সা.) খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আমি নফল নামাজ পড়ি আবার ঘুমাই, রোজা রাখি আবার রাখি না, বিয়েও করেছি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ অনুসরণ করতে অনাগ্রহী, সে আমার দলের নয়। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস ৪৭৭৬; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস ১৪০১)
এই ভারসাম্যপূর্ণ পরিমিতি শরিয়তের অপরিমেয় সৌন্দর্য। আকিদা ও বিধি-বিধানের সব ক্ষেত্রে এই সুসামঞ্জস্য সুস্পষ্ট।
খবরওয়ালা/টিএসএন