খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
বিগত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হলেও দেশে ‘মব সন্ত্রাস’ বা উন্মত্ত জনতার তাণ্ডব নিয়ন্ত্রণে না আসা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা। বিশেষ করে ১৮ই ডিসেম্বর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার পর যেভাবে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানটের মতো ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা চালানো হয়েছে, তাকে তিনি পুলিশের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও কর্তব্য পালনে চরম শৈথিল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড আউট’-এ অংশ নিয়ে তিনি সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
সাবেক এই পুলিশ প্রধানের মতে, মব বা উন্মত্ত জনতা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে হতাহতের আশঙ্কা থাকার যে যুক্তি পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত একটি ‘মন্দ অজুহাত’। তিনি মনে করেন, পুলিশের কাজই হলো কঠিন পরিস্থিতি সাহসের সাথে মোকাবিলা করা। ১৯ জন সদস্য নিহতের ট্রমা বা মানসিক ধাক্কার দোহাই দিয়ে দেড় বছর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গাফিলতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। নুরুল হুদা স্পষ্ট করে বলেন, যারা অন্যায় আদেশ পালন করে মানুষ হত্যায় লিপ্ত হয়েছিল, কেবল তাদের মনোবলে আঘাত লাগার কথা; কিন্তু সামগ্রিক বাহিনীর পেশাদারিত্বে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কাম্য নয়।
১৮ই ডিসেম্বর রাতের সেই নারকীয় তাণ্ডব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাবেক আইজিপির মূল্যায়নের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | নুরুল হুদার বিশ্লেষণ ও মন্তব্য |
|---|---|
| মব সন্ত্রাসের ধরন | এটি নিছক উন্মত্ত জনতা নয়; বরং নির্দিষ্ট আদর্শের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা। |
| পুলিশের ভূমিকা | সময়মতো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থা গ্রহণে স্পষ্ট ‘শৈথিল্য’ পরিলক্ষিত। |
| হতাহতের অজুহাত | মব নিয়ন্ত্রণে হতাহতের ভয় পাওয়া পুলিশের জন্য একটি ‘মন্দ অজুহাত’ মাত্র। |
| সমাধানের পথ | দ্রুত নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ও কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। |
| নির্বাচনী পরিবেশ | সারা দেশে ক্যাম্পেইন শুরু হলে ঢাকাকেন্দ্রিক মব কমে আসবে; শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব। |
| নিরাপত্তা ঝুঁকি | হিটলিস্টে থাকা ব্যক্তিদের গানম্যান দেওয়া সাময়িক সমাধান; স্থায়ী হলে অস্ত্রের লাইসেন্স জরুরি। |
শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খুনিরা যদি দেশের ভেতরে থাকে তবে তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হবে না। এই খুনের নেপথ্যে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা গোষ্ঠীগত শত্রুতা আছে কি না, তা উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও যোগ করেন যে, ১৮ই ডিসেম্বরের হামলাগুলো ছিল মূলত নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর, যাদের আদর্শিক অবস্থান হামলাকারীদের বিপক্ষ। এই ধরনের ধ্বংসাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিদের কঠোরভাবে দমন করার কোনো বিকল্প নেই।
ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় নুরুল হুদা অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি মনে করেন, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে হেয় করেছে। অতীত থেকে শুরু করে বর্তমানেও দেখা যায় যে, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল কঠোর হলেই চলবে না, বরং রাজনৈতিকভাবেও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা দূর করতে শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এখানে শৈথিল্য দেখানোর বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।