খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনার আঁচ এবার দক্ষিণ এশিয়ায় এসে পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য ভারতীয় বন্দরগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে—এমন এক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর কঠোর ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। বুধবার (৪ মার্চ) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই জল্পনা ও অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উপদেষ্টা ডগলাস ম্যাকগ্রেগর উগ্র-ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে কৌশলগত সুবিধার জন্য মার্কিন নৌবাহিনী সম্ভবত ভারতের বন্দরগুলো ব্যবহার করছে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, কারণ ঐতিহাসিকভাবে ভারত যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক জোট বা অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, ‘ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পুরোপুরি সত্যবর্জিত। ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো দেশের সামরিক বাহিনীকে ভারতের বন্দর বা অবকাঠামো ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় আরও সতর্ক করে বলেছে যে, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও উগ্র প্রচারণামূলক খবর আঞ্চলিক শান্তি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য হুমকিস্বরূপ।
নিচে ভারত মহাসাগর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে চলমান উত্তেজনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো:
| ঘটনার বিবরণ | সংক্ষিপ্ত তথ্য ও ফলাফল |
| অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু | ভারতীয় বন্দর মার্কিন নৌবাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া। |
| বিবৃতি দাতা | ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA)। |
| ইরানি যুদ্ধজাহাজ বিধ্বস্ত | শ্রীলঙ্কার জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ডুবে গেছে। |
| প্রাণহানির তথ্য | ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনায় অন্তত ৮৭ জন নিহত। |
| ভারতের অবস্থান | কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে। |
ভারতের এই অস্বীকারের মধ্যেই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। বুধবার ভারত সংলগ্ন শ্রীলঙ্কার জলসীমায় মহড়া শেষে ফেরার পথে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন সাবমেরিনের অতর্কিত টর্পেডো হামলার শিকার হয়ে ডুবে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজটি ভারতের কাছাকাছি কোনো এলাকা থেকে মহড়া শেষ করে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়। এই ঘটনায় অন্তত ৮৭ জন ইরানি নাবিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক তৎপরতার প্রমাণ দেয়।
ভারত বর্তমানে এক কঠিন কূটনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সাথেও ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও জ্বালানি স্বার্থ জড়িত। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর এবং রাশিয়ার সাথে উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের (INSTC) ক্ষেত্রে ইরানের গুরুত্ব ভারতের কাছে অপরিসীম। এ অবস্থায় মার্কিন বাহিনীকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো এবং পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পক্ষে নয়। তবে ভারত মহাসাগরে মার্কিন ও ইরানি নৌবাহিনীর এই সরাসরি সংঘর্ষ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য রুটের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহের চেইন এই যুদ্ধের ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে সাধারণ মানুষকে এবং সংবাদমাধ্যমকে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো মন্তব্য না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যখন দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, তখন ভারত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।