খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ক্ষমতাধর সামরিক জান্তা সরকারের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল সাদিও কামারা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হয়েছেন। রাজধানী বামাকোর সন্নিকটে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্যারিসন শহর কাতি-তে তার নিজ বাসভবনে এই হামলা চালানো হয়। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের সমন্বিত এই আক্রমণ মালির বর্তমান সামরিক প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবৃতি অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে মালির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিদ্রোহীরা একযোগে হামলা শুরু করে। রোববার মালি সরকারের মুখপাত্র ইসা উসমান কুলিবালি আনুষ্ঠানিকভাবে কামারার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেন। হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক এলাকা কাতি।
হামলার সময় বিদ্রোহীরা কামারার বাসভবন লক্ষ্য করে আত্মঘাতী গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পরবর্তীতে গুলিবর্ষণ করে। উল্লেখ্য যে, এই এলাকাটি মালির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আসিমি গোইতা-রও আবাসস্থল। তবে সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রেসিডেন্ট গোইতা বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছেন। হামলার পরপরই তাকে বিশেষ নিরাপত্তায় অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই হামলায় কামারার পাশাপাশি তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দুই নাতি-নাতনিও প্রাণ হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মালির উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে অস্থিরতা বিরাজ করলেও, এবারের হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। বিশ্লেষকদের মতে, ইতিপূর্বে যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করত, তারা এখন মালি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই হামলায় প্রধানত দুটি গোষ্ঠী অংশ নেয়:
১. জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (JNIM): এটি আল-কায়েদার একটি আঞ্চলিক শাখা।
২. আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট (FLA): এটি মূলত তুয়ারেগ যোদ্ধাদের একটি সংগঠন।
বিশ্লেষক বুলামা বুকারতির মতে, এই গোষ্ঠীগুলো ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলেও গত বছর থেকে তারা মালি সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার চুক্তি করেছিল। সাম্প্রতিক এই বড় আকারের হামলা সেই চুক্তিরই প্রতিফলন।
জেনারেল সাদিও কামারা কেবল একজন মন্ত্রী ছিলেন না, বরং ২০২০ ও ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। মালির রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীতে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম।
| বিষয় | বিবরণ |
| পদবি | জেনারেল ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী (মালি) |
| রাজনৈতিক প্রভাব | সামরিক জান্তা সরকারের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তিত্ব |
| হামলার স্থান | কাতি (গ্যারিসন শহর), বামাকোর নিকটবর্তী |
| হামলার ধরণ | আত্মঘাতী গাড়িবোমা ও সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ |
| হামলাকারী পক্ষ | জেএনআইএম (JNIM) এবং তুয়ারেগ বিদ্রোহী (FLA) |
| নিহতদের তালিকা | সাদিও কামারা, তার দ্বিতীয় স্ত্রী ও দুই নাতি-নাতনি |
মালির বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে রাজধানী বামাকো, উত্তরাঞ্চলীয় গাও, কিদাল এবং মধ্যাঞ্চলীয় সেভারে শহরে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কিদাল শহরে এখনো ভারী গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
এই নৃশংস হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU), ইউনাইটেড স্টেটস ব্যুরো অব আফ্রিকান অ্যাফেয়ার্স, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) পৃথক বিবৃতিতে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এছাড়া অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC) এর মহাসচিবও এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে মালিতে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কামারার মৃত্যু মালির সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তাকে অনেকেই মালির ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে দেখতেন। তার অনুপস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ভূখণ্ড ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মালিতে আরও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।