খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের প্রথম মহাসাগরীয় স্যাটেলাইট ভূ-স্টেশনের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত এই কেন্দ্রটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আগামী জুন মাসে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত বছরের ২৬ মার্চ শুরু হওয়া এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে দিয়েছে চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি। বাকি প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
প্রায় ৪২০ টেরাবাইট তথ্য সংরক্ষণ সক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি বর্তমানে শেষ পর্যায়ের পরিচালনাগত প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য মোট ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আংশিক সংযোগ সফলভাবে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। চীনের কয়েকটি স্যাটেলাইট থেকে তুলনামূলক ভালো মানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার স্যাটেলাইট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বর্তমানে কোন স্যাটেলাইট থেকে কী ধরনের তথ্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্টদের মতে, এই কেন্দ্র চালু হলে আবহাওয়ার পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, নদীভাঙন, বন উজাড়সহ পরিবেশ–সম্পর্কিত তথ্য দ্রুততম সময়ে পাওয়া যাবে। বর্তমানে এসব তথ্য পেতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন কেন্দ্র চালু হলে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং তথ্য সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে নেমে আসতে পারে।
এর ফলে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ণয়, উপকূলীয় বন্যার পূর্বাভাস তৈরি, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন–সংক্রান্ত বিশ্লেষণ দ্রুত করা সম্ভব হবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য মাছ ধরার উপযুক্ত অঞ্চল শনাক্ত করে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা যাবে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ–সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটির সমন্বয়ক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক নয়, বরং গবেষণা ও শিক্ষার প্রসার। শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নির্ধারিত নিয়মে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন, যা একাডেমিক গবেষণা ও প্রকাশনায় সহায়ক হবে।
তিনি আরও জানান, এটি একটি তথ্য গ্রহণকেন্দ্র, যেখানে কেবল তথ্য গ্রহণ করা হয়, প্রেরণ করা হয় না। তাই এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা মূলত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারত্বের অংশ।
এই উদ্যোগটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট এই কেন্দ্রকে স্বতন্ত্র গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন দেয় এবং নামকরণ করে “স্যাটেলাইট মহাসাগর পর্যবেক্ষণ ও তথ্য উদ্ভাবন কেন্দ্র”। কেন্দ্রটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক মোসলেম উদ্দিনকে।
প্রকল্পটি সচল রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের ভাগাভাগি করা হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক চাপ কমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ৭ থেকে ৯ জুনের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কেন্দ্রটি চালু হতে পারে। কেন্দ্রটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ ও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্প ব্যয় | প্রায় ৭০ কোটি টাকা |
| বিদেশি সহায়তা | চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (প্রায় ৫০ কোটি টাকা) |
| দেশীয় ব্যয় | প্রায় ২০ কোটি টাকা |
| তথ্য সংরক্ষণ ক্ষমতা | প্রায় ৪২০ টেরাবাইট |
| পরিকল্পিত স্যাটেলাইট সংযোগ | ১১টি |
| বর্তমানে সংযুক্ত | প্রায় ৭টি (আংশিক) |
| সম্ভাব্য চালু সময় | জুন মাস (পরীক্ষামূলক কার্যক্রম) |
| প্রধান ব্যবহার | আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ পর্যবেক্ষণ |