খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধারকৃত অজ্ঞাত পরিচয় নারী ও নবজাতকের মরদেহের রহস্য গত ছয় দিনেও উদ্ঘাটিত হয়নি। পুলিশ এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গুনটিয়া গ্রামে লৌহজং নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে এই অর্ধগলিত মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক ও কৌতূহল বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০ এপ্রিল সোমবার বিকেলে গুনটিয়া গ্রামের লৌহজং নদীর পাড়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ পান। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে নদীর পাড়ে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় মানুষের চুল দেখতে পেয়ে এলাকাবাসী মির্জাপুর থানা পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে মির্জাপুর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং নির্দিষ্ট স্থানে মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, বস্তাটি বাইরে বের করার পর দেখা যায় তার ভেতরে একজন নারী এবং একটি নবজাতকের মরদেহ রয়েছে। মরদেহ দুটি দীর্ঘ সময় মাটির নিচে থাকায় তাতে পচন ধরেছিল এবং অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল।
উদ্ধারের পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিচয় শনাক্তের প্রাথমিক চেষ্টা চালায়। তবে মরদেহে পচন ধরায় এবং স্থানীয়ভাবে কেউ তাদের শনাক্ত করতে না পারায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটিকে মির্জাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দাফন করা হয়। নিহতদের ডিএনএ (DNA) প্রোফাইলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ দাবিদার এলে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহগুলো উদ্ধারের সময় বস্তাটি ঝাকুনি দেওয়ার সাথে সাথে নারীর মরদেহের পাশেই নবজাতকের দেহটি পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, নিহত নারী প্রায় ৭-৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে:
ময়নাতদন্ত: মরদেহ দুটি টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
ডিএনএ টেস্ট: পরিচয় শনাক্তের লক্ষ্যে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য টিস্যু ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা: মামলার জট খুলতে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) টিমকে যুক্ত করা হয়েছে।
সারাদেশে বার্তা প্রেরণ: পরিচয় শনাক্তের জন্য নিহতদের বিবরণ ও তথ্য দেশের সকল থানায় বার্তা হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, টাঙ্গাইলে জনৈক গর্ভবতী নারীকে ধর্ষণের পর তাঁর পেট থেকে শিশু বের করে মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ এই তথ্যটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন এ প্রসঙ্গে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা প্রচার করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও অপপ্রচার। মরদেহ উদ্ধারের তথ্য সত্য, কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বা ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা রিপোর্ট পাওয়ার পরই কেবল বলতে পারব এটি পরিকল্পিত হত্যা নাকি অন্য কোনো দুর্ঘটনা।” তিনি সাধারণ মানুষকে এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে গুজব না ছড়াতে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ছয় দিন পার হয়ে গেলেও পরিচয় ও খুনের রহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় গুনটিয়া গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এই নারী ও নবজাতক এই এলাকার বাসিন্দা নন। অন্য কোনো স্থান থেকে তাঁদের হত্যা করে নির্জন নদীর পাড়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। লোহজং নদীর পাড় এলাকাটি নির্জন হওয়ায় অপরাধীরা এই স্থানটিকে মরদেহ গুম করার জন্য বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে মির্জাপুর থানার পুলিশ এবং পিবিআই যৌথভাবে এই ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত নারীর বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হতে পারে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেলে এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের ধরন এবং নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ এ বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোনো তথ্য থাকলে তা দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।