খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১০ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
প্রকৃতির রহস্যময় ভাণ্ডার সমুদ্রের অতল গহ্বর থেকে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু জীব উপরে উঠে আসে, যা মানবকুলকে যুগপৎ বিস্মিত ও আতঙ্কিত করে। সম্প্রতি মেক্সিকোর কাবো সান লুকাস সৈকতে মার্কিন পর্যটকদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বিশালাকায় দুটি ‘ওরফিশ’ (Oarfish), যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে এটি একটি বিরল ঘটনা হলেও প্রাচীন লোককথা ও সামুদ্রিক ঐতিহ্যে এই মাছের উপস্থিতি মানেই আসন্ন কোনো মহাপ্রলয় বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।
গত মাসে মেক্সিকোর নীল জলরাশিঘেরা সৈকতে মোনিকা পিটেঞ্জার এবং তার বোন কেটি যখন ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তারা বালুর ওপর রুপালি ফিতার মতো ছটফট করতে থাকা দুটি অদ্ভুত প্রাণী দেখতে পান। সাধারণত সমুদ্রের ৩ হাজার ফুট গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না (টোয়াইলাইট জোন), সেখানে এই মাছগুলোর আবাস। পিটেঞ্জার জানান, প্রায় ৩০ ফুট লম্বা এই মাছ দুটি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার ভিনগ্রহী প্রাণীর মতো লাগছিল। ৫-৬ জন মানুষের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মাছ দুটিকে গভীর সাগরে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে এই দৃশ্য দেখার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক কাজ করছে।
ওরফিশকে জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘রিউগু নো সুকাই’, যার অর্থ হলো ‘সমুদ্র দেবতার প্রাসাদের বার্তাবাহক’। শত বছরের পুরনো বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মাছ যখনই সমুদ্রের তটরেখায় ভেসে আসে, তখনই পৃথিবীর ওপর বড় কোনো দুর্যোগ নেমে আসে। নিচে ওরফিশের বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত সারণী দেওয়া হলো:
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| আবাসস্থল | সমুদ্রের ৩,০০০ ফুটেরও বেশি গভীরতা (টোয়াইলাইট জোন) |
| সর্বোচ্চ আকার | ৩৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং ৬০০ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন |
| প্রাচীন বিশ্বাস | ভূমিকম্প, সুনামি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা |
| রেকর্ডকৃত ঘটনা | গত এক শতাব্দীতে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে মাত্র ১৯ বার দেখা গেছে |
| শারীরিক গঠন | আঁশহীন রুপালি শরীর এবং মাথায় লাল রঙের ঝুঁটির মতো ডানা |
ওরফিশ নিয়ে মানুষের ভীতি কেবল কুসংস্কার নয়, বরং কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কাকতালীয় মিল একে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। ২০১১ সালে জাপানের তোহোকু অঞ্চলে ৯.১ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এবং সুনামির মাত্র কয়েক মাস আগে প্রায় ২৪টি ওরফিশ জাপানের বিভিন্ন উপকূলে ভেসে উঠেছিল। সেই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া ২০১৭ সালে ফিলিপাইনে হওয়া ভূমিকম্পের ঠিক আগেই সমুদ্র তীরে এই মাছের দেখা মিলেছিল।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য এই লোকবিশ্বাসের কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনো পাননি। সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, ওরফিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী। সমুদ্রের তলদেশে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পরিবর্তন তারা আগেভাগে টের পেতে পারে, যার ফলে তারা আতঙ্কিত হয়ে অগভীর পানিতে চলে আসে। আবার অনেক সময় অসুস্থতা বা প্রজননগত সমস্যার কারণেও তারা উপকূলে ভেসে উঠতে পারে। তবে মেক্সিকোর এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিজ্ঞান ও লোককথার দ্বন্দ্বে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।