খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১ মার্চ ২০২৫
জি এম কিবরিয়া: একদা তোমার বাবা ছিলেন তোমার মেন্টর (পরামর্শদাতা)। কি কৌতুহল! বাবা সব জানে কীভাবে?
অতঃপর নবম দশম শ্রেণির ইংরেজি-গণিত, বিজ্ঞান-ভূগোলে বাবার আমতা আমতা, তোমাকে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ফেলে একদিন; যদিও বাবাকে তুমি ভালবাস; তবুও কলেজের তরুণ শিক্ষকটির কথা জাদুমন্দ্রের মতো লাগে। এভাবে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরকে দেখে মুগ্ধ। মনে মনে ভাব, ইস! যদি মাধ্যমিকে এই স্যারের মতো কাউকে পেতাম? তবে যে জীবনের অর্জন ঢের বেশি হতো!
মাথায় ঘুরপাক খায়, প্রফেসর সাহেব কীভাবে তোমার সব কথার উত্তর জানে! এটি অত্যন্ত কৌতূহলের বিষয়। তোমার অজান্তেই তুমি কিন্তু বাবা থেকে প্রফেসরে ধাবিত হয়েছো। এভাবেই তোমার মেন্টর পরিবর্তন হচ্ছে। যদিও তুমি সতর্ক বা সচেতন ছিলেন না।
কিন্তু কর্মক্ষেত্র?
এখানেও মেন্টর প্রয়োজন। কিন্তু অন্য ধরনের মেন্টর এখানে পাবে। খোঁজে নিতে হবে তোমাকেই। যিনি যাপিত জীবনের মাধ্যমে তোমাকে খাঁটি সোনা করে তুলবেন!
কিন্তু কীভাবে?
তিনি কি পিতার মতো তুলুতুলু করবেন? কিংবা তোমার শিক্ষকের মতো?
না।
তিনি তাঁর প্রয়োজনে তোমাকে তৈরি করবেন। কামার যেমন লোহা গলিয়ে পেরেক বানায়, পেরেকটি বেঁকে গেলে বা জুতসই না হলে তা ভাঙারি গ্রেডে ফেলে দেন, তেমনি তোমাকেও সাইড করে ফেলবেন, যদি তুমি জুতসই না হও।
মনের দুঃখে তুমি বসের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতেই পার; চাকরির গোষ্ঠী কিলাইতেই পার [দেশের ৯০% তরুণ যা করে]; তোমার দাম্ভিক ও মিথ্যা অহংকারে দিগ্বিদিক ছুটতেই পার; এক সময় নোংরা রাজনীতি বা দুর্নীতির আশ্রয়ে অনেক অর্থবিত্তের মালিক হতেই পার; কিন্তু তোমাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা কি অর্জিত হলো?
জীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না। কিংবা তোমাকে পুনরায় সুযোগ দেবে না।
যখন দেখবে তোমার মেধা কোন কাজে লাগল না; তোমার শ্রম পণ্ড হয়েছে; তুমি হতাশাগ্রস্ত হবে, আফসোস করবে কিংবা হিংসা করবে তোমার বন্ধুটিকে, যে সফল হয়েছে জীবনের শিক্ষায়।
কেন তুমি পরাজিত হলে? কী সমস্যা ছিল? নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছো, জীবনের শেষ বসন্তে।
সহজ উত্তর, তোমার যথার্থ কোন মেন্টর ছিল না। যিনি তোমাকে জীবনমুখী করতে পারতেন। আফসোস।
তিনি কি তোমার কাছে এসে বলবেন, আমি তোমার মেন্টর হতে চাই! না, তিনি শত ব্যস্ত। তুমি চাইলেও তিনি সহজে ধরা দেবেন না। আর ধরা দিলেও তিনি তোমার সাথে কঠোর হবেন, তোমাকে নানা পরীক্ষার মধ্যে ফেলবেন। একবার তোমার মনে হবে, তিনি তোমাকে তাঁর স্বার্থে কাজ করাচ্ছেন বা ব্যবহার করছেন। ভুল, তোমার মতো এই নাদান বালক তাঁকে কি সুবিধা দিচ্ছো? গভীর ভাবে ভেবে দেখ। শৈবাল দীঘীরে বলে উচ্চ করে শির, লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির। তোমায় কি দরকার তাঁর? অথচ তোমারই দরকার ছিল তাঁকে। তুমি চিনতে পারনি। ভিশন দরকার ছিল। যিনি তোমাকে জীবনের শিক্ষা দিতে পারতেন।
তাঁর পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকোনা কেন! প্রভুভক্ত কুকুরের মতো; যেমন, প্লেটো সক্রেটিসের পায়ের কাছে বসেছিল।
তুমি যদি আগেই জানতে, রিয়েলিটি শকট্ জিনিসটি কি? কিভাবে ইহা ফেস করতে হয়? কিভাবে পরিশ্রম ও কৌশলের মাধ্যমে কর্মজীবন বা ব্যবসায় সফল হতে হয়? কিংবা তোমার ছাত্রজীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি কিভাবে কর্মজীবনে তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু বা প্রতিযোগী হয়ে উঠবে? তবে কতোইনা ভাল হতো! যদি আগেই জানতে এসব, তবে তুমি এরূপ লেজে গোবরে হতে? না। তুমি সতর্ক হতে। পরিশ্রমী ও ন্যায়নিষ্ট হতে। দায়িত্বশীল হতে পারতে। অপরের দিকে আঙুল তুলতে না কিংবা অদৃষ্টের দোষ দিতে না। তিনিই এসব বিষয়ে তোমাকে শিক্ষিত করে তুলতেন।
অথচ চিনতে পারোনি তাঁকে।
তিনি কি তোমার পিতা? নাকি শিক্ষক? তিনিতো অন্য কেউ। তোমার সাথে তিনি কি ফরমালিটি দেখাবেন? না। আশা করাও ভুল। তিনি তোমাকে শুধু গড়ে তুলতে চান, জীবনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে, যোগ্য শিষ্য রূপে। যদি এরূপ মেন্টরের দেখা না পাও, তবে তুমি অভাগা বটে।
শুধু কি কর্মজীবন?
না। জীবনের জন্যও মেন্টর প্রয়োজন। তুমি ভাবনায় নিমজ্জিত হোও! দেখবে, জীবন তোমাকে কত প্রশ্ন করছে। গুগল-ইউটিউবের এত জ্ঞান, এত কথা তোমার মনে ধরবে না। কারণ তোমার জ্ঞান পিপাসা সাগর তুল্য।
এই পিপাসার মূল্য অনেক। জ্ঞানের পিপাসাই তার কাছে নিয়ে যাবে তোমাকে। যদি পিপাসা জাগ্রত হয়, তবে প্রশ্ন কর। তোমার যাকে ভালো লাগে তাকেই প্রশ্ন কর। ফেস টু ফেস। মোবাইল ফোনে অবশ্যই নয়। যার কথায় তোমার মনে প্রশান্তি আসে, তিনিই আপাতত তোমার মেন্টর।
মনে রাখবে, নিজে অধিক জ্ঞানী হলেও তুমি ঐ জ্ঞান গর্ব নিয়েই কথা বল, শেয়ার কর কারোর সাথে। ঝালাই করে নাও নিজেকে। আর যদি অহংকার পেয়ে বসে তোমাকে, তবে কোন দিন মেন্টর খুঁজে পাবে না।
লেখক: একজন সমাজকর্মী এবং ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন ও গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা
খবরওয়ালা/ এমএজেড