মো. আবদুস সালাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর। এ অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রাম ১৯৮৩ সালে প্রণীত হয় যা ১৯৮৪ সালে কার্যকর হয়েছে। ১৯৮৪ সালে অধিদপ্তরের অধীনে ৪টি বিভাগীয় কার্যালয়, ২১টি জেলা শিক্ষা অফিস, ১০৫টি সরকারি কলেজ, ১০টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ৩টি সরকারি মাদ্রাসা এবং ১৭৪টি সরকারি স্কুলসহ সর্বমোট ২৯২টি প্রতিষ্ঠান ছিল। এছাড়া ঐ সময়ে মাত্র ১০৬ কোটি টাকা সরকারি অনুদান প্রদানের মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হত এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে।
বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ৯টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা শিক্ষা অফিস, ৫১৬টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, ৬৮৬টি সরকারি কলেজ, ৭০৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ৫টি উচ্চ মাধ্যমিক টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), ২০১৪ এর তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১,২৩২টির মধ্যে স্কুলের সাথে কলেজ রয়েছে ১,৫১৪টি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে ২,৯৩,২৮৯ জন এবং ৯০,৬৩,৪২২ জন। ১৯৮৪ সালে অধিদপ্তরের ২৩৫ কোটি টাকার বাজেট বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় মোট ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা নিশ্চিত করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। শিক্ষা কাঠামো ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) কর্তৃক আয়োজিত Impact Analysis on Education Governance and Management শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে ‘বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবা কেন্দ্র’ (বিএফআরসিএসসি) একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। উক্ত প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ হিসেবে দু’টি পৃথক অধিদপ্তর সৃজন করার পরামর্শ প্রদান করা হয় (সংলাপ-১)।
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সচিব-সভায় মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রত্যেক মন্ত্রণালয়/বিভাগকে প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য মার্চিং অর্ডার প্রদান করায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক গত ২৮ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে সময়াবদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনা দাখিল করা হয়। উল্লিখিত প্রস্তাবনাসমূহের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’-এ দু’টি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (সংলাপ-২)।
এছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের জানুয়ারি ২০২৫ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষা সার্ভিসের সংস্কারের জন্য নিম্নরূপ বিশেষ সুপারিশ করা হয়েছে (সংলাপ-৩):
“পৃথক মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর হতে মাধ্যমিক বিভাগকে পৃথক করে আলাদা ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা অঙ্গীভূত থাকার কারণে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে না এবং ক্রমেই মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান হ্রাস পাচ্ছে। তাই এটি আলাদা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।”
২০০৩ সালে শিক্ষা বান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে যে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর করার জন্য সুপারিশ করা হয় এবং স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রাম কী হবে তাও কমিশনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সুপারিশে ৯ নং ক্রমিকে জেলা শিক্ষা অফিসারের পদকে উপপরিচালকের সমমর্যাদার ক্ষমতা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯ নং ক্রমিকে বলা হয়েছে শিক্ষকদের ক্যারিয়ার উন্নয়নের পথ খোলা রাখতে হবে। শিক্ষকতার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মসম্পাদন দক্ষতার মাধ্যমে তারা যেন উচ্চতর পদে উন্নীত এবং নিয়োগ পেতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত শিক্ষকবৃন্দ যাতে পর্যায়ক্রমে সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং উচ্চমাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে এবং পরিচালক পদেও নিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এত চমৎকার একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন এবং ইতিবাচক এতগুলো সুপারিশ থাকার পরেও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আলাদা একটি অধিদপ্তরের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।
জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এর অধ্যায় ২৭-এ বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দু’টি পৃথক অধিদপ্তর—যথাক্রমে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’—গঠনের উল্লেখ থাকলেও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের জন্য পৃথক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশনের পর গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ সুস্পষ্টভাবে মাধ্যমিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রীদের কলেজপ্রীতির কারণে (ভবনের শাহেদুল খবির চৌধুরী ও চাঁদপুরের কলেজ অধ্যক্ষ রতন গংদের) জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ তথা অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া স্যারের কমিশনের সুপারিশ এবং শিক্ষানীতি ২০১০-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা মাধ্যমিকের উন্নয়নে আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া স্যারের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের (২০০৩) সুপারিশের ২ নং ক্রমিকে বলা হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনা, তত্ত্বাবধান, প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করা কাম্য।
উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদি অন্য অধিদপ্তর গঠন করে সেখানে ন্যস্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ এখানে মাধ্যমিকের জন্য একটি আলাদা অধিদপ্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। উক্ত সুপারিশে ৫ নং ক্রমিকে আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়কে পরিচালক (মাধ্যমিক) পদ সৃষ্টি করে সেখানে মাধ্যমিকের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদায়নের কথা বলা হয়েছে।
নানাবিধ বঞ্চনার ফলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক ও কর্মকর্তাগণের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা কমিশন, শিক্ষার রিপোর্ট, শিক্ষা আইন দেশে প্রণয়ন করা হয়েছে তার সবকটিতেই মাধ্যমিকের জন্য আলাদা অধিদপ্তরের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলা থাকা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর করা হয়নি। অথচ অনেক পূর্বেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শিক্ষা খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর মাধ্যমিক স্তরের জন্য স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর করা হচ্ছে না। যার ফলে নানা ধরনের বঞ্চনা আর বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর। নেই কোনো সঠিক নিয়োগবিধি, নেই যৌক্তিক পদসোপান। দেশের প্রায় সাতশতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিন শতাধিক প্রধান শিক্ষক, পাঁচ শতাধিক সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য; ৩৩ জেলায় জেলা শিক্ষা অফিসার ও প্রায় সকল সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য। দেশে ২৬ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে ২২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক স্তরের। অথচ শিক্ষাভবনে বিশাল মাধ্যমিক স্তরের জন্য মাত্র তিনজন মাধ্যমিক স্তরের কর্মকর্তা আছেন—যার মধ্যে একজন উপপরিচালক ও দুইজন সহকারী পরিচালক। শিক্ষা ভবনে মাধ্যমিকের কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থা। শিক্ষাস্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অধিদপ্তর আলাদা করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, সবুজবাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঢাকা