দুরারোগ্য ব্যাধি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত আড়াই বছরের নাজনীন রাইসা হাসপাতালের শয্যায় বাবার কোলে নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু তার বাবার মনে চলছে তীব্র উৎকণ্ঠা। প্রতি মাসেই বাগেরহাট থেকে রাজধানীতে এসে মেয়ের জন্য রক্ত সংগ্রহ করতে হয় তাঁকে। সাধারণ সময়ে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও রমজান এলেই সেই সংগ্রাম হয়ে ওঠে আরও কঠিন। প্রয়োজনীয় রক্ত না পেলে থেমে যেতে পারে শিশুটির জীবনরেখা।
রমজান মাসে রক্তদানের প্রবণতা কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। থ্যালাসেমিয়া রোগী ছাড়াও অগ্নিদগ্ধ, কিডনি রোগী, প্রসূতি জটিলতা এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ সেই তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ এই রোগের বাহক, যা সংখ্যায় প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি। বর্তমানে দেশে ৮০ হাজারেরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিয়মিত রক্তের ওপর নির্ভরশীল।
নিচের সারণিতে দেশের রক্তের চাহিদা ও জোগানের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বিষয় |
পরিমাণ/হার |
| বার্ষিক রক্তের চাহিদা |
৮–১০ লাখ ব্যাগ |
| স্বেচ্ছাসেবীদের জোগান |
৩৫–৪০ শতাংশ |
| থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা |
৮০ হাজারের বেশি |
| দৈনিক রক্তের প্রয়োজন (একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল) |
৩০–৫০ ব্যাগ |
| প্রতি রোগীর মাসিক চাহিদা |
১–৩ ব্যাগ |
চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ, যার কোনো স্থায়ী প্রতিকার নেই। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন ও ব্যয়বহুল ওষুধের প্রয়োজন হয়। এই চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও কিছু সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
রমজানে রক্তসংকটের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে এ সময়ে রক্তের চাহিদা কমে যায়। বাস্তবে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসার জন্য বিপুল রক্ত প্রয়োজন হয়। দিনের বেলায় রোজার কারণে অনেকেই রক্ত দিতে অনিচ্ছুক থাকেন, আবার ইফতারের পর যানজটের কারণে দাতারা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সমন্বিত রক্তদাতা তালিকার অভাব। অধিকাংশ হাসপাতালের নিজস্ব রক্তদাতা গোষ্ঠী না থাকায় রোগীর স্বজনদেরই রক্ত সংগ্রহের ভার নিতে হয়। এতে করে তারা নানা ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি নির্ভরযোগ্য রক্তদাতা ডাটাবেজ তৈরি, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং সারা বছরজুড়ে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। মানবিক এই উদ্যোগই পারে অসংখ্য অসহায় মানুষের জীবন বাঁচাতে।