খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: 11শে বৈশাখ ১৪৩২ | ২৪ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
চট্টগ্রামের রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। গত আট মাসে এই উপজেলায় ১২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার অধিকাংশের ঘটনায় কোনো আসামিকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এর ফলে নিহতদের স্বজনদের অনেকে মামলা করার পর এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
সর্বশেষ গত শনিবার মধ্যরাতে যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহকে খাওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় স্ত্রী চেমন আরা ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করলেও হত্যাকারীরা এখনো ধরা পড়েনি। পরিবারটি এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
গত ২৪ জানুয়ারি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন রাউজানের নোয়াপাড়ার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। আসামির নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করার পর পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে যান তাঁর স্ত্রী।
শুধু মানিক আবদুল্লাহ কিংবা জাহাঙ্গীরের পরিবার নয়; স্বজন খুন হওয়ার পর মামলা করে ভয়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছে এমন চারটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। প্রত্যেকে ভয় আর আতঙ্কের কথা বলেছেন।
গত আট মাসে চট্টগ্রামের রাউজানে ১২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কেউ গুলিতে, কেউ পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর। কিন্তু এসব ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযানে কার্যকর তৎপরতা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৯টি মামলায় আসামির ঘরে লেখা হয়েছে ‘অজ্ঞাতনামা’। ১০টি মামলায় এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত প্রক্রিয়ায়ও পুলিশের অনীহা ও উদাসীনতার অভিযোগ করেছেন অন্তত ছয়জন বাদী।
যেসব মামলায় আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর বাদীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, মামলার পরও অভিযুক্তরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিচ্ছে না।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলেই আসে রাজনৈতিক চাপ। ওইসব আসামির বেশিরভাগই বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী। স্থানীয় থানায় তাদের প্রতিনিধিরা বসে থেকে সিদ্ধান্ত দেন কার বিরুদ্ধে মামলা হবে, কার বিরুদ্ধে হবে না। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে সরেজমিনে থানায় গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।
রাউজানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষিতে গত আট মাসে চারবার ওসি বদল করা হলেও খুনের ঘটনা থামছে না।
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে বুধবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেক সময় সন্ত্রাসীরা অপকর্ম করে পাহাড়ের দিকে চলে যায়।’
তবে এক সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খুনের মামলার আসামিরা অনেকেই এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ‘যদি এলাকায় থাকে, এখনই রেঞ্জ ডিআইজিকে নির্দেশ দিয়ে গেলাম। তাদের বিষয়ে যেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতুকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে এক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি রাউজানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
যেভাবে ১২ খুন
আবদুল মান্নান : প্রকাশ্যে মান্নানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় গত ২৮ আগস্ট। পরে রাউজানের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় সড়কের পাশের জঙ্গল থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মান্নানের পরিবারের অভিযোগ, এ ঘটনার পর রাউজান থানায় গেলে সেই সময়ের ওসি জাহিদ হোসেন মামলা নেননি। পরে তারা কাউখালী থানায় এজাহার দেন, সেখানেও মামলা হয়নি।
সর্বশেষ চট্টগ্রাম আদালতে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা করার কথা জানিয়েছেন মান্নানের স্ত্রী জান্নাতুল নুর। এ হত্যায় জড়িত কেউ শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়নি এখনও।
মো. ইউসুফ মিয়া : রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমের বাগানবাড়ি থেকে গত ১ সেপ্টেম্বর ইউসুফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন তিনি নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় মামলা না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তাঁর স্বজন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় পুলিশও হত্যার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়নি। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজম খান : নিখোঁজের চার দিন পর গত ২৯ অক্টোবর দুপুরে রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের মইশকরম এলাকা থেকে পুলিশ আজমের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় হত্যা মামলা করেন আজমের স্ত্রী লাকী আকতার। এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মাওলানা আবু তাহের : নিখোঁজের তিন দিনের মাথায় চিকদাইর ইউনিয়নের কালাচাঁন চৌধুরী ব্রিজ-সংলগ্ন সর্তাখাল থেকে গত ১১ নভেম্বর তাহেরের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ওলামা লীগের সদস্য ছিলেন।
নিরাপত্তার ভয়ে পরিবার মামলা করতে রাজি না হওয়ায় অপমৃত্যু মামলা করে পুলিশ। এখন পর্যন্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, তাঁকে হত্যা করার পর লাশ খালে ফেলে রাখা হয়েছিল।
জাহাঙ্গীর আলম : মোটরসাইকেলে চেপে জুমার নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় গত ২৪ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। পরিবারের তরফ থেকে হত্যা মামলা করার পর পুলিশ বিএনপি নেতা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী যুবদল নেতা আরফাত মামুন, রমজান আলী, বিপ্লব বড়ুয়া ও গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
মোহাম্মদ হাসান : রাউজানে যুবলীগকর্মী মুহাম্মদ হাসানকে ১৯ ফেব্রুয়ারি ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এক দল দুর্বৃত্ত। তাঁর পরিবার মামলা করেনি। ঘটনার এক মাস পর রাউজান থানার বর্তমান সেকেন্ড অফিসার কাউসার হামিদ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
কমর উদ্দিন জিতু : স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া নিয়ে প্রতিপক্ষের পিটুনি ও ছুরিকাঘাতে গত ১৫ মার্চ নিহত হন জিতু। তাঁর স্ত্রী ডেইজি আকতার রাউজান থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয় নি।
মো. রুবেল : রাউজানের পূর্বগুজরা ইউনিয়নের বৃহত্তর হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশের জমি থেকে গত ২১ মার্চ রুবেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গরুচোর সন্দেহে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে দাবি পুলিশের। তাঁর ভাই সোহেল বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। হত্যায় জড়িত কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি।
নূর আলম বকুল : পারিবারিক দ্বন্দ্বে দুই ভাইয়ের ধারালো অস্ত্র ও রডের আঘাতে গত ৪ এপ্রিল খুন হন প্রকৌশলী মো. নূর আলম বকুল। এ ঘটনায় বকুলের আরেক ভাই রাজু থানায় হত্যা মামলা করেন। এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
মো. জাফর : রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের মাহামুনি দীঘি থেকে গত ১৭ এপ্রিল জাফরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁকে হত্যা করে দীঘিতে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। হত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন জাফরের ভাই সাইফুল ইসলাম। কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
মানিক আবদুল্লাহ : রাতের খাবার খাওয়ার সময় গত শনিবার মুখের ভেতর অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে মানিককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় রাউজান থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাঁর স্ত্রী চেমন আরা।
মোহাম্মদ ইব্রাহিম : যুবদলকর্মী ইব্রাহিমকে গত মঙ্গলবার দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইব্রাহিম হত্যার পর সন্ত্রাসীরা দুই কিলোমিটার দূরে আরও একটি কিলিং মিশনে গিয়ে অটোরিকশাচালককে হাতে-পায়ে গুলি চালিয়ে ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। গুলিবিদ্ধ অটোরিকশাচালক নাঈম উদ্দিনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি।
মামলা নিতে গড়িমসি : গত শনিবার মধ্যরাতে যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ খুনের পর সোমবার বেলা ১১টার দিকে রাউজান থানায় মামলা করতে যান মানিকের স্ত্রী চেমন আরা। দুই ছেলেমেয়েসহ সঙ্গে ছিলেন দু’জন রাজনৈতিক নেতা, এক প্রতিবেশী। থানাতেই কথা হয় তাদের সঙ্গে। প্রতিবেশী মোহাম্মদ রানা বলেন, ‘বেলা ১১টায় থানায় এসেছি। এখন বিকেল সাড়ে ৫টা বাজে। এখনও মামলা নেয়নি পুলিশ। কেন মামলা নিতে গড়িমসি করছে, জানি না।’ সন্ধ্যা ৭টার দিকে মামলা করে বাড়ি ফেরেন তারা।
চারবার ওসি বদল : রাউজানের পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছেন চট্টগ্রামের এসপি। এর আগে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ওসিকে আরও কঠোর হতে বলেছিলেন তিনি। রাজনৈতিক তদবির উপেক্ষা করে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে নির্দেশও দেন। দুই মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ পর্যন্ত।
রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যাচ্ছে না। কারণ, প্রতিটি হত্যা পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ করা যতটা সহজ, হত্যাকাণ্ড ততটা সহজ নয়। আসামিদের গ্রেপ্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসার আগে অনেক ঘটনা ঘটেছে। তার পরও জড়িতদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
খবরওয়ালা/এসআর