খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রোববার রাতে প্রকাশ্য দিবালোকে একদল দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে মো. মাহিম মিয়া (১৫) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়েছে। অত্যন্ত জনাকীর্ণ একটি গলিতে ১০ থেকে ১২ জন কিশোরের একটি দল মাহিমকে ঘিরে ধরে এই হামলা চালায়। এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এলাকাভিত্তিক ‘কিশোর গ্যাং’-এর পূর্ববিরোধ বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মাহিম তার এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে কাজলা এলাকার স্কুল গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ১০ থেকে ১২ জন কিশোরের একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল মাহিমের গতিরোধ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। মাহিম রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন এবং মাহিমের বন্ধু রায়হান বিষয়টি তাঁর পরিবারকে অবগত করেন। মাহিমের ভগ্নিপতি রাফিসহ স্বজনেরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা রাত সোয়া ১১টার দিকে মাহিমকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিচে নিহত মাহিমের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্যের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
টেবিল: নিহতের ব্যক্তিগত তথ্য
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নাম | মো. মাহিম মিয়া |
| বয়স | ১৫ বছর |
| পেশা/পরিচয় | মাদ্রাসাছাত্র (হেফজ বিভাগ) |
| পিতার নাম | দীন ইসলাম (ফল ব্যবসায়ী) |
| স্থায়ী ঠিকানা | বেতাল গ্রাম, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা। |
| বর্তমান ঠিকানা | কাজলা এলাকা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা। |
| ঘটনার স্থান | স্কুল গলি, কাজলা, যাত্রাবাড়ী। |
| মৃত্যুর স্থান | ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। |
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, নিহতের মরদেহে একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানাকে বিষয়টি ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।
যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজলা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত কয়েক মাসে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই গ্যাংগুলোর সদস্যরা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হয়। মাহিমের মতো একজন শান্ত স্বভাবের মাদ্রাসাছাত্র কেন তাঁদের লক্ষ্যবস্তু হলো, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মাহিমের পিতা দীন ইসলাম কিশোরগঞ্জের একজন সাধারণ ফল ব্যবসায়ী। ছেলেকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজধানীর একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা। মাহিমের স্বজনদের দাবি, যারা প্রকাশ্য রাস্তায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। তারা কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজধানীর প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত যাত্রাবাড়ীতে রাতের বেলা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টহল আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কাজলা এলাকায় সোমবার সকালে মৌন মিছিল করার কথা জানিয়েছেন মাহিমের সহপাঠীরা।