খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৯ আগস্ট ২০২৫
দেশের বাম ধারার দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে না পারে, তাহলে টিএসসিতে ‘রাজাকারের’ ছবি টানানোর ঘটনা দেশের সব অঞ্চলে আরও দ্রুত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে মনে করেন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ একটি উপনিবেশের মতো অবস্থায় রয়েছে, যার শাসনের দায়িত্বে আছে বুর্জোয়া শ্রেণি।
শনিবার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এই মত ব্যক্ত করেন।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার ‘৩৬ জুলাই: আমরা থামবো না’ শীর্ষক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত নেতাদের ছবি প্রদর্শন করে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
একাত্তরে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় ‘আল বদর’ ও ‘আল শামস’ নামক বাহিনী গঠন করেছিল।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। আগে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিল, এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শাসকরা, অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণি একই ধরনের শাসন চালাচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, ‘বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশেও প্রবলভাবে বিরাজমান। সরকার পতনের পর মনে হয়েছিল ফ্যাসিবাদ শেষ হয়েছে, কিন্তু পুঁজিবাদী ফ্যাসিবাদ এখন চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দক্ষিণপন্থিরা শক্তিশালী হচ্ছে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদীদের আধিপত্য বাড়ছে।’
এই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ মনে করেন, এখন সামাজিক বিপ্লব গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, ‘যারা সমাজতন্ত্র ও সামাজিক মালিকানে বিশ্বাস করে, তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে। এটি ৫৪ সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্টের মতো হালকা হবে না, বরং বামপন্থিদের শক্তিশালী জোট হবে।’
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই যুক্তফ্রন্টের শক্তির ওপর। ঐক্য ছাড়া সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়। নিজেদের মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার পতনের পর বুর্জোয়া শ্রেণি শক্তিশালী হয়েছে; ধর্মনিরপেক্ষ বুর্জোয়া, সেক্যুলার বুর্জোয়া, নন-সেক্যুলার বুর্জোয়া এবং ধর্মব্যবসায়ী বুর্জোয়া—all একই শ্রেণি। একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা হচ্ছে, টিএসসিতে রাজাকারদের ছবি টানানো হচ্ছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড আরও তীব্র হবে যদি বামপন্থিরা ঐক্যবদ্ধ না হয়।’
প্রবীণ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা আসলে বুর্জোয়া শ্রেণির অন্তর্গত এবং ব্যক্তি মালিকানায় বিশ্বাসী।’
তিনি বলছেন, ‘সুতরাং যারা সমাজ পরিবর্তন করতে চান, তাদের একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে।’
এদিকে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র, শ্রমিক ও জনতা বুলেটের মুখোমুখি হয়ে বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু রক্তের দাগ শুকানোর আগেই তাদের মধ্যে হতাশা চলে এসেছে, যা অস্বাভাবিক নয় কারণ বর্তমান সরকার বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।’
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-র সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে গতকালও রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য মব সৃষ্টি করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির, রাজাকার-আল বদর, এনসিপির ছাত্ররা, যারা গুপ্ত রাজনীতি করছে।’
তার মতে, ‘এরা বুর্জোয়া সংস্কার চালাচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে জাতীয় মূলনীতির বিরুদ্ধে।’
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ফেসবুক বক্তব্য তুলে ধরে ফিরোজ বলেন, ‘২৪ সালের গণআন্দোলন একাত্তরের চেয়ে বড় নয়। একাত্তরকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেয়া হবে না।’
বাসদ-মার্কসবাদীর প্রধান সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন শেষ হয়নি। যেই ক্ষমতায় এসেছে তারা সবাই ফ্যাসিবাদী, তাই আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
আলোচনা সভায় ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন আহমেদ নাসু সভাপতিত্ব করেন।
বক্তৃতায় অংশ নেন ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার নেতা হারুন অর রশিদ ভূঁইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সংগঠক সুনয়ন চাকমা।
খবরওয়ালা/এন