খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 7শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন পরিণত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টে সুরের মূর্ছনায় মেতেছিল হাজারো সংগীতপ্রেমী। দীর্ঘ কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার কারণে বড় কনসার্ট বন্ধ থাকার পর এই আয়োজনটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রশান্তির নিশ্বাস। রাত যখন পৌনে বারোটা, তখন মঞ্চে জেমসের কালজয়ী গান ‘বাংলাদেশ’ বেজে ওঠার সাথে সাথে যেন ফিরে আসে এক হারানো আবেগ।
রাত ১১টায় নগরবাউল জেমস যখন মঞ্চে পদার্পণ করেন, তখন পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ‘গুরু, গুরু’ ধ্বনিতে। জেমস শুরু করেন তার চিরসবুজ গান ‘কবিতা’ দিয়ে। একে একে ‘দিওয়ানা মাস্তানা’, ‘মা’, ‘দুষ্ট ছেলের দল’ গেয়ে দর্শকদের উন্মাদনায় ভাসান তিনি। জেমসকে কিছুটা শারীরিক অসুস্থতার মাঝেও (মাঝে মাঝে আদা-চা পান করতে দেখা যায়) ভক্তদের ভালোবাসার টানে গান চালিয়ে যেতে দেখা যায়।
তবে অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে রাত পৌনে বারোটায়। জেমস যখন ড্রামার ফান্টিকে ইশারা করলেন, গিটারের সেই পরিচিত ঝংকারে বেজে উঠল প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুর করা ‘বাংলাদেশ’। গানে গানে যখন উঠে এল—‘তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনে জ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ/তুমি ধানের শিষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন’—তখন দর্শক সারিতে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন এই গানটি মঞ্চে গাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অলিখিত গুঞ্জন থাকলেও, নগরবাউল জেমস আবারো প্রমাণ করলেন সংগীত কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়।
কনসার্টে অংশগ্রহণকারী ব্যান্ড ও শিল্পীদের তালিকা:
| পরিবেশনার ক্রম | ব্যান্ড/শিল্পীর নাম | উল্লেখযোগ্য গানসমূহ |
| ১ | দিলশাদ নাহার কনা | রেশমি চুড়ি, ধিতাং ধিতাং |
| ২ | শিরোনামহীন | হাসিমুখ, এই অবেলায়, বন্ধ জানালা |
| ৩ | জেফার রহমান | ঝুমকা, হার মানা হার |
| ৪ | ওয়ারফেজ | পূর্ণতা, অসামাজিক, অবাক ভালোবাসা |
| ৫ | নগরবাউল (জেমস) | বাংলাদেশ, কবিতা, দুষ্ট ছেলের দল, পাগলা হাওয়া |
উপস্থাপক রাফসান সাবাবের সাবলীল সঞ্চালনায় সন্ধ্যা থেকেই মঞ্চে ছিল টানটান উত্তেজনা। ব্যান্ড ‘শিরোনামহীন’ যখন তাদের ‘হাসিমুখ’ গানটি শুরু করে, হাজারো ভক্তের মুঠোফোনের আলোয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন এক নক্ষত্রখচিত উদ্যানে পরিণত হয়। এরপর জেফার রহমানের গানে তরুণ প্রজন্মের নাচ আর ওয়ারফেজের কড়া রক মিউজিকে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। ওয়ারফেজের ‘পূর্ণতা’ গানের সময় দর্শকদের কণ্ঠের কোরাস ছিল শোনার মতো।
জেফার ও রাফসানের রসায়ন দর্শকদের আলাদা বিনোদন যোগায়। বিশেষ করে জেফারের ‘ঝুমকা’ গানের তালে নাচে মেতে ওঠে উপস্থিত জনতা। দীর্ঘ বিরতির পর এমন প্রাণবন্ত পরিবেশ যেন সংগীতপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।
জেমস তার গানের ফাঁকে দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “তোমরা আমার জান, তোমরাই আমার প্রাণ। তোমরা আছ বলেই আমি আছি।” ভক্তদের উচ্ছ্বাস সামলাতে নিরাপত্তাকর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। রাত ঠিক বারোটায় ‘আসবার কালে আসলাম একা’ গানটির মধ্য দিয়ে জেমস তার পরিবেশনা শেষ করেন। একই সাথে পর্দা নামে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নামক এই বিশাল আয়োজনের।
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি কনসার্ট ছিল না, বরং এটি ছিল এক সম্মিলিত নবযাত্রা। হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে একসাথে জাতীয় আবেগের গানগুলো গাওয়ার এই দৃশ্যটি ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।