খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হককে আজ সকালে তার ধানমন্ডির নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮১ বছর বয়সী এই প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ একাধারে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক এবং সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ে বহু গ্রন্থের প্রণেতা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন তার তিন প্রাক্তন ছাত্র—আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তবুও, একজন বিচারপতি হিসেবে আদালতে প্রদত্ত রায়ের কারণে আজ তাকে গ্রেপ্তার হতে হলো।
তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের সর্বস্তরে—“তার অপরাধ কী?”
সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও স্পষ্ট করে জানায়নি কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী বাতিল–সংক্রান্ত রায়ে “জালিয়াতি” এবং “ক্ষমতার অপব্যবহার” করেছেন তিনি।
এই অভিযোগে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে, যিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সাধারণ আসামির মতো গ্রেপ্তার করার ঘটনা শুধু আইনত নয়, নৈতিক দিক থেকেও গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিচারপতি খায়রুল হক তার কর্মজীবনে কিছু ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। সংবিধানের ৫ম ও ১৩তম সংশোধনী বাতিল–সংক্রান্ত রায় বিশেষভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত ছিল।
৫ম সংশোধনী বাতিল করে তিনি সামরিক শাসনের বৈধতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আর ১৩তম সংশোধনী বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন—যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
কিন্তু এসব রায় বিচারিক যুক্তি ও সংবিধানিক ব্যাখ্যার আলোকে প্রদান করা হয়—নিরপেক্ষতা, দায়িত্ব এবং বিচারিক সাহসিকতার এক উদাহরণ হিসেবে।
রায় যদি কারও অপছন্দ হয়, তবে সমালোচনা করা যায়, আইনি পুনর্বিবেচনার পথ খোলা থাকে—তবে এজন্য বিচারপতিকে গ্রেপ্তার?
এটি শুধু “বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ” নয়, এটি ভবিষ্যতের বিচারকদের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা—”সরকারবিরোধী বা অজনপ্রিয় রায় দিলে আপনিও হতে পারেন পরবর্তী শিকার!”
এই ধরনের নজির আমরা কেবল পাকিস্তানের সামরিক শাসনামলেই দেখেছি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে, বা বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে, শুধুমাত্র রায় দেওয়ার জন্য কোনো বিচারপতির গ্রেপ্তারের আরেকটি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিচারপতি খায়রুল হক শুধু একজন বিচারপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন জ্ঞান, ন্যায় এবং যুক্তির বাতিঘর। তার লেখা সংবিধান-সংক্রান্ত রায়গুলোতে ইতিহাস, ন্যায়বিচার ও বিচারিক যুক্তির এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।
এই গ্রেপ্তার শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ৮১ বছর বয়সী এক প্রবীণ বিচারপতিকে, যিনি আজীবন দেশ ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন, তাকে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা অকল্পনীয়।
এটা যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য এক অশুভ বার্তা।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের প্রাণ।
খবরওয়ালা/এমএজেড