খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) অবশেষে বেসরকারি মালিকানায় চলে গেল। দীর্ঘ আর্থিক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিতর্কের মধ্য দিয়ে টালমাটাল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার এর ৭৫ শতাংশ শেয়ার বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত নিলামে ১৩৫ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপির বিনিময়ে এ শেয়ার কিনে নেয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আরিফ হাবিব ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ। পাকিস্তানের বিমানের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক লেনদেন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকার ঘোষিত রেফারেন্স মূল্য ছিল ১০০ বিলিয়ন রুপি। নিলামে অংশ নেয় তিনটি প্রতিষ্ঠান—আরিফ হাবিব ইনভেস্টমেন্ট, লাকি সিমেন্টের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান এবং এয়ার ব্লু। প্রতিযোগিতা ছিল টানটান, বিশেষত প্রথম দুই বিডের মধ্যে। লাকি সিমেন্টের কনসোর্টিয়াম ১৩৪ বিলিয়ন রুপি প্রস্তাব করলেও এক ধাপ ওপরে উঠে আরিফ হাবিব গ্রুপই জয়লাভ করে। বেসরকারি বিমান সংস্থা এয়ার ব্লুর প্রস্তাব ছিল মাত্র ২৬.৫ বিলিয়ন রুপি, ফলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
নিলাম ও বিড বিস্তারিত তুলনামূলক সারণি
| বিডিং প্রতিষ্ঠান | প্রস্তাবিত মূল্য (পাকিস্তানি রুপি) | ফলাফল |
|---|---|---|
| আরিফ হাবিব ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ | ১৩৫ বিলিয়ন | বিজয়ী |
| লাকি সিমেন্ট নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম | ১৩৪ বিলিয়ন | নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী |
| এয়ার ব্লু | ২৬.৫ বিলিয়ন | পরাজিত |
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত এ নিলামকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ “দেশের অর্থনীতিতে পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং জানান, নিলামের মাধ্যমে পিআইএ পুনরুজ্জীবনের পথ তৈরি হলো।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইচ্ছা করলে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ শেয়ার ক্রয়ের সুযোগও থাকবে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের সামনে। এতে পূর্ণ মালিকানা গ্রহণের পথও উন্মুক্ত থাকছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন ব্যবস্থাপনা পিআইএকে পুনর্গঠন, রুট সম্প্রসারণ ও সেবা উন্নয়নের মাধ্যমে আবারও প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পিআইএ একসময় পাকিস্তানের সম্মানের প্রতীক ছিল। ১৯৬০–এর দশকে আন্তর্জাতিক রুটে সম্প্রসারণ, আধুনিক বহর এবং বিশ্ববিখ্যাত ডিজাইনার পিয়েরে কার্ডিনের তৈরি ইউনিফর্ম—সব মিলিয়ে সংস্থাটি দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ এয়ারলাইনের মর্যাদা অর্জন করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, লোকসান, বিমানের পুরোনো বহর ও নিরাপত্তা ত্রুটিতে আস্থা কমে যায়। ২০২০ সালে করাচিতে এ-৩২০ মডেলের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য পিআইএর ফ্লাইট নিষিদ্ধ করে।
বর্তমানে ৩৪টি বিমানের মধ্যে মাত্র ১৮টি কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছর ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে ফ্লাইট পুনরায় চালুর অনুমতি পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে এখনও পিআইএ ফিরতে পারেনি। নতুন মালিকানায় বহর আধুনিকীকরণ, লোকসান ঘোচানো ও আন্তর্জাতিক রুটে ফিরে আসাই হবে প্রতিষ্ঠানের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের বিমান শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এ বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনে বড় মাইলফলক হবে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এখন নজর থাকবে—আরিফ হাবিব গ্রুপ কিভাবে পিআইএকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখে এবং পুরনো সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারে।