খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
রুশ ফেডারেশনের দীর্ঘকালীন শাসনকর্তা ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই প্রচারমাধ্যমের শক্তি ও দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের বিবরণ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, পুতিন রাশিয়াকে একটি ভঙ্গুর উদীয়মান গণতন্ত্রের পথ থেকে ক্রমান্বয়ে একটি কঠোর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত অবয়ব ও ভাবমূর্তিও অত্যন্ত চতুরতার সাথে সমসাময়িক রাজনীতির উপযোগী করে পরিবর্তন করেছেন।
বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে বেড়ে ওঠা ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন মূলত আধুনিক দূরদর্শন বা টেলিভিশন যুগের সন্তান। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন গোয়েন্দাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকের কঠোর স্বভাবের এবং স্বল্পভাষী গুপ্তচর নায়কেরা ছিলেন তাঁর শৈশবের আদর্শ। পুতিন নিজেও একাধিকবার স্বীকার করেছেন যে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সেসব কাল্পনিক চরিত্রই তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন বেছে নিতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন যাবত প্রচারের আলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের শেষ ভাগে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক পতনের পর তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অধীনে এবং পরবর্তীতে মস্কোয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বোরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনিক দপ্তরে একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ আমলা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময়কার আলোকচিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুতিন সব সময় মূল নেতৃত্বের পেছনে কিংবা এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনই ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকাতেন না। সোভিয়েত নেতার প্রপৌত্রী নিনা ক্রুশ্চেভের মতে, তৎকালীন গোয়েন্দা মহলে পুতিনকে তাঁর আড়ালে থাকার এবং অতি সহজে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার অসামান্য দক্ষতার কারণে ‘মথ’ বা পতঙ্গ নামে ডাকা হতো।
১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আকস্মিকভাবে রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর এবং পরবর্তী বছরগুলোতে পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পুতিন এবং তাঁর জনসংযোগ উপদেষ্টারা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার প্রধানতম মাধ্যম হলো দূরদর্শনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি নিজেকে তাঁর পূর্বসূরি বোরিস ইয়েলৎসিনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর একজন সুঠাম ও যোগ্য নেতা হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হন, যাঁর অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে প্রায়শই রুশ রাষ্ট্রকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলত।
ভ্লাদিমির পুতিন নিজেকে একজন সম্পূর্ণ মদ্যপানহীন, কর্মক্ষম, সুস্থ ও সক্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের সাথে নৈশভোজে অন্যান্যদের উৎকৃষ্ট মানের ওয়াইন পরিবেশন করা হলেও পুতিন সাধারণত মধু মেশানো এক কাপ চা পান করেই সন্তুষ্ট থাকতেন এবং তাঁর সহযোগীরাও কঠোরভাবে এই প্রচার অক্ষুণ্ণ রাখতেন। তিনি নিজের শৌর্য, যৌবন ও শারীরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আধুনিক যুদ্ধবিমান চালানো, জুডো খেলায় নিজের পারদর্শিতা প্রদর্শন করা এবং খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়া, নদীতে মাছ ধরা বা শক্তিশালী ভঙ্গিতে সাঁতার কাটার মতো বহুবিধ প্রচারণামূলক চিত্রে অবতীর্ণ হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরানৎসেভের মতে, এটি ছিল মূলত জনগণের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তাঁর জনসংযোগ দলের তৈরি করা কর্তৃত্ববাদী প্রচারের এক আধুনিক রূপ।
২০১১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক জীবন ও বাহ্যিক অবয়বে একটি দৃশ্যমান ও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জনসমক্ষে তাঁর মুখাবয়ব আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুগম্ভীর, মসৃণ ও ভাবলেশহীন হয়ে ওঠে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানাবিধ কারিগরি ও চিকিৎসাগত জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর এক বিশাল বিজয়ী সমাবেশে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিছু সমাজবিজ্ঞানী একে প্রকৃত আবেগ বললেও, অন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে রাশিয়ার একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই সময়কালের পর থেকেই মূলত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভিন্নমত প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাকে আইনিভাবে কঠোর হস্তে দমন করা শুরু হয়।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী এই রুশ নেতাকে জনসমক্ষে আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পর থেকে তিনি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত, নিশ্ছিদ্র ও সুরক্ষিত পরিবেশ ছাড়া ক্যামেরার সামনে আসেন না। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময়ের ক্রীড়াবিদ ও বীরোচিত অ্যাকশন-হিরোর ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করা এই প্রবীণ নেতা বর্তমানে নিজেরই তৈরি করা এক কঠোর দমন-পীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির ফাঁদে আটকা পড়েছেন, যেখান থেকে পিছু হটার পথ তাঁর নিজের নিরাপত্তার জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তর ও তাঁর ভাবমূর্তি পরিবর্তনের প্রধান সময়কালসমূহ নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সময়কাল বা বছর | রাজনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য |
| ১৯৬০-১৯৭০ এর দশক | সোভিয়েত দূরদর্শনের গুপ্তচর চরিত্রগুলোর দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হওয়া। |
| ১৯৯০-এর দশক | কেজিবির দায়িত্ব শেষে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কোর প্রশাসনে আড়ালে থাকা আমলা। |
| ১৯৯৯-২০০০ বছর | রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রহণ এবং পূর্বসূরির বিপরীতে সুস্থ ও সক্রিয় ভাবমূর্তি তৈরি। |
| ২০০৭ বছর | মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’-এর বর্ষসেরা ব্যক্তি হিসেবে কঠোর জাতীয়তাবাদী নেতার ছবির প্রকাশ। |
| ২০০৮-২০১২ বছর | প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালেও প্রকৃত ক্ষমতার নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে সক্রিয় থাকা। |
| ২০১১-২০১২ বছর | অবয়বের আমূল পরিবর্তন এবং অশ্রুসিক্ত চোখে পুনরায় দেশের সর্বোচ্চ পদে আরোহণ। |
| ২০২২-২০২৬ (বর্তমান) | ইউক্রেন যুদ্ধ কেন্দ্রিক কঠোর, অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত দূরদর্শন উপস্থিতি। |
ভ্লাদিমির পুতিনের এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তর ও প্রচারকৌশল এটিই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং জনমানস নিয়ন্ত্রণে আধুনিক গণমাধ্যম কতটা শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করতে পারে।