রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক-এর বাধ্যতামূলক ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা চার বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ব্যাংক তদারকি বিভাগের সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্যাংকটির বাধ্যতামূলক ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৭৬ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী বছরগুলোতে এটি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩ সালে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। চার বছরে এই ঋণ বৃদ্ধির হার ৯১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বছরভিত্তিক বাধ্যতামূলক ঋণের চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| বছর |
বাধ্যতামূলক ঋণ (ডলার) |
| ২০২১ |
৯৭৬ মিলিয়ন |
| ২০২৩ |
১.২৩ বিলিয়ন |
| ২০২৪ |
১.৪৯ বিলিয়ন |
| ২০২৫ |
১.৮৭ বিলিয়ন |
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমদানিকারক নির্ধারিত সময়ে ঋণপত্র পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে বিদেশি ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করে এবং সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে ঋণ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বাধ্যতামূলক ঋণ বলা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমদানিকারকদের দায় পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে এ ধরনের ঋণ বাড়ছে, যা ব্যাংকের তারল্য ও সম্পদের গুণগত মানে চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বাধ্যতামূলক ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, এই ধরনের ঋণ বৃদ্ধি পেলে তা অনাদায়ী ঋণে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এবং ব্যাংকের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
রূপালী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাধ্যতামূলক ঋণের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিভিন্ন পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাংক বিদেশি ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকেরা তা পরিশোধ করেনি।
পরিদর্শনে ব্যাংকটির বৈদেশিক মুদ্রা কার্যক্রমে অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতার বিষয়ও উঠে এসেছে। ব্যাংকটি আমদানি বাবদ ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাঠালেও পণ্য দেশে প্রবেশের প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। এই অনিষ্পন্ন প্রমাণপত্র অর্থ পাচার ও বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে ঢাকার রাজারবাগ এলাকায় নতুন অনুমোদিত বৈদেশিক শাখা খোলার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির ২৮টি অনুমোদিত বৈদেশিক শাখা রয়েছে। গত চার বছরে ব্যাংকটির আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
| সূচক |
২০২১ |
২০২৫ |
| আমদানি |
৩.১৭ বিলিয়ন ডলার |
৮৩৬ মিলিয়ন ডলার |
| রপ্তানি |
৩৮৬ মিলিয়ন ডলার |
২১৩ মিলিয়ন ডলার |
| প্রবাসী আয় |
৭০৮ মিলিয়ন ডলার |
২৯৩ মিলিয়ন ডলার |
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৬০ শতাংশ।
পরিদর্শনে পাঁচটি বৈদেশিক শাখায় মোট ৪৬টি গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি, বিদ্যমান খেলাপি থাকা সত্ত্বেও নতুন ঋণ প্রদান এবং রপ্তানি আয়ের অর্থ অন্য ঋণ সমন্বয়ে ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে, আহসান হাবিব বলেন, বাধ্যতামূলক ঋণ ও অনিষ্পন্ন আমদানি প্রমাণপত্রের বৃদ্ধি ব্যাংকের জন্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি প্রমাণপত্র বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, শুল্ক মূল্যায়ন ও ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে এই অমিল সৃষ্টি হয়েছে।